আচ্ছা কেউ যদি বলে যে, “রোকেয়া মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত না, বরং ইসলামের মূল কাঠামোর প্রতি চ্যালেঞ্জকারী এবং ঔপনিবেশিক প্রভাবপুষ্ট একজন ইসলাম-বিদ্বেষী নারীবাদী ছিলো।” এটা শুনে কি বর্তমান প্রগতিশীল নারী মহল তাঁকে সহজে ছেড়ে দিবে?
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ কথার শোনার সাথে সাথে প্রগতিশীল নারী মহল ক্ষোভে ফুলে ফেঁপে বলে উঠবে “এ তো সেই পুরাতন যুগের ঘেরাটোপ জড়ানো ‘জুজুবুড়ী’র মতো কথা বলছে! এই পর্দানশীল মোল্লা-অনুরাগী পুরাতন পন্থী সমালোচককে অবিলম্বে বর্জন করো, নাহলে সমাজে প্রগতির বাতাস লাগবে না!”
আহা প্রগতি আপা থামুন, এক দন্ড নিশ্বাস নিন। ক্ষোভে তো প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। যদিও আপনাদেরকে উদ্দেশ্য করে আমি কোনো বাক্যব্যয় করছি না। এই লিখাটি শুধু মাত্র সেসব মুসলিম নারীদের জন্য, যারা এতদিন বেগম রোকেয়াকে “মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত” ভেবে চরম ভুল করছিলো। তবুও, ক্রোধদমন করে আপনারাও চাইলে পড়তে পারেন। বেগম রোকেয়া যে কোনোভাবেই “মুসলিম নারীর” জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব না, তা স্পষ্ট করে তোলাই এই লিখার উদ্দেশ্য।
রোকেয়াকে নিয়ে হালকা পাতলা সমালোচনা করলেই একদল বলে উঠে, “রোকেয়া যেই সমাজ থেকে উঠে এসেছে, সে সময় নারীকে জড় বস্তু ভাবা হতো। তা থেকে তিনিই তোমাদের উঠিয়ে এনে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে!” আচ্ছা আসলেই কি রোকেয়া সেই সমাজ আর তৎকালীন নারীমহলের প্রতিনিধিত্ব করতো?
রোকেয়ার চিন্তাধারার উৎস, তার পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমির পরিপ্রেক্ষিতেই গড়ে উঠে ছিলো। তিনি ছিলেন ধনাঢ্য জমিদার বংশের কন্যা। তার স্বামী খানবাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার সামাজিক ওই অবস্থান, তাকে সাধারণ মূলধারার মুসলিম সমাজের সংগ্রাম থেকে বের করে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যশীল একটি এলিট শ্রেণীর কেন্দ্রে স্থাপন করে।
তার পড়াশোনার শুরু হইয়াছিল ইউরোপিয়ান গভর্নেসের কাছে এবং পরবর্তীতে তিনি স্বামীর তত্ত্বাবধানে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করে। যা সেই সময়ে ব্রিটিশবিরোধী মুসলিমদের কাছে নিন্দনীয় ছিল। রোকেয়ার নারীমুক্তির আদর্শ মূলত পশ্চিমা সাহিত্য ও উদারনৈতিক দর্শন থেকে আমদানি করা ছিল। তিনি পশ্চিমা লেখকদের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম সমাজের রীতিনীতির সমালোচনা করে। তার ব্যক্তিগত নানা ঘটনার পটভূমি দ্বারা এটা নিশ্চিত হয় যে, তার নারী জাগরণের আহ্বানটি ছিল কলোনিয়াল লিবারেল চিন্তাধারার ফসল।
রোকেয়ার সাহিত্যকর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইসলামের মৌলিক আকিদা, নবুয়ত ও রিসালাতের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা। তিনি আল্লাহ তা’আলা প্রদত্ত নবী ও রাসুল মনোনীত হওয়াকে অস্বীকার করে, রিসালাত ও নবুয়তের এই পুরো পদ্ধতিকে মানবিক প্রতিভা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তিনি যুক্তি দেন, “এঁরা নিজেদের ‘ঈশ্বরপ্রেরিত দূত কিংবা দেবতা’ বলিয়া প্রকাশ করিয়া ‘অসভ্য বর্বরদিগকে শাসন’ করার কৌশল লইয়াছিলেন।” এই বক্তব্য রাসুলগণের মর্যাদার প্রতি চরম অবমাননাকর। রাসুলগণের পাশাপাশি তাঁদের অনুসারীদেরও তিনি “অসভ্য বর্বর” বলে অবমাননা করে।
এছাড়া তার লেখনী ছিল, ইসলামের মৌলিক বিধান সমূহের তীব্র সমালোচনার কেন্দ্র। যেসব কোনোভাবেই সামাজিক সংস্কারের আহ্বান হতে পারে না, বরং আল্লাহ তা’আলা প্রদত্ত ঐশী বিধানের উৎস ও পবিত্রতার প্রতি সরাসরি অবিশ্বাস প্রদর্শন করা। রোকেয়া কুরআনের আয়াতের উপর সন্দেহ পোষণ করে লিখে, “নারী নরের অধীন থাকিবে, ইহা ঈশ্বরেরই অভিপ্রেত… কিন্তু একথার আমার সন্দেহ আছে। কারণ দিদীমাদের এ জ্ঞান পুরুষদের নিকট হইতে গৃহীত,”। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি শুধুমাত্র কোনো প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নাই, বরং তিনি এই ধারণার ঐশ্বরিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো।
মানব সৃষ্টির ক্রম এবং পারিবারিক কাঠামো সম্পর্কিত বিধানসমূহ স্বয়ং আল-কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এই প্রসঙ্গে, সূরা নিসা-এর ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা পুরুষের কর্তৃত্ব বা ‘কাওয়ামাহ’ সম্পর্কে বলেন,“পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক(কাওয়ামুন), এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।“(সূরা নিসা, ৩৪)
‘কাওয়ামুন’ শব্দটি দ্বারা পুরুষের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও নারীর প্রতি সুবিচারের নিশ্চয়তা বহন করে। রোকেয়া যখন এই বিধানকে ‘মনগড়া জ্ঞান’ রূপে আখ্যায়িত করে এর সত্যতা নিয়ে ‘সন্দেহ’ প্রকাশ করে, তখন তা শুধুমাত্র সামাজিক রীতিনীতির সমালোচনা থাকে না। বরং তখন সেটা হয়ে যায়, সরাসরি আল্লাহর কিতাবের ‘নস্স’ (সুস্পষ্ট পাঠ)-এর বৈধতা এবং ঐশ্বরিক উৎসকে অস্বীকার করার নামান্তর। ইসলামী ‘উসুল আল-ফিকহ’ অনুযায়ী, কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতের কর্তৃত্বে সন্দেহ পোষণ করা ঈমানের মূল ভিত্তিকে আঘাত করে, এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইরতিদাদের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তাছাড়া, রোকেয়া শরিয়া আইনকে আল্লাহ তা’য়লা প্রদত্ত বিধান না মেনে পুরুষের রচিত বিধান হিসেবে চিহ্নিত করে। তিনি দাবি করে, ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষদের দ্বারা ‘প্রতারণা করিবার নিমিত্ত’ রচিত। তিনি যখন লেখে, “মহাত্মা মহম্মদ আইন প্রস্তুত করিলেন যে, ‘রমণী সর্ব্বদাই নরের অধীনা থাকিবে’,” তখন তিনি সচেতনভাবে শরিয়া আইনের বদলে ‘মহম্মদ আইন’ শব্দটি ব্যবহার করে যা প্রাচ্যবাদীদের অনুকরণ করা ছিলো। এই বক্তব্য রাসুলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়তকে অস্বীকার করার নামান্তর। শারিয়া রাসুলুল্লাহ (সা) প্রণীত কোনো আইন না, বরং তা আল্লাহ প্রণীত শাশ্বত বিধান। তিনি পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর অর্দ্ধেক ভাগ পাওয়ার শরিয়া আইনকে কঠোর সমালোচনা করে, নারীকে ‘পুরুষের অর্দ্ধেক’ বলে উপহাস করে। ঐশ্বরিক আইনকে এভাবে বৈষম্যমূলক বলে সরাসরি চিহ্নিত করা, শারিয়া বিধানের প্রতি তার চরম বিরক্তি প্রমাণ করে।
ইসলামে পর্দা বা হিজাবকে নারীর শালীনতা, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। রোকেয়ার লেখায় পর্দা প্রথার প্রতি ছিল চরম ঘৃণা। তিনি পর্দাকে সরাসরি ‘দাসত্বের শৃঙ্খল’ এবং নারীকে ‘পেঁচকের মত লুকাইয়া’ থাকার সাথে তুলনা করেছিল। তার আক্ষেপ, “কেন জন্ম লভিলাম পর্দ্দা-নশীন ঘরে!”, যা প্রমাণ করে তিনি মুসলিম জীবনধারার এই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় চিহ্নের প্রতি তীব্র ব্যক্তিগত বিদ্বেষ পোষণ করতো। তিনি বোরকা পরিহিতা নারীদের ‘ভূত’, ‘জুজুবুড়ী’ বা ‘আসবাব’ বলে ব্যঙ্গ করেছিলো। এ ধরনের অবমাননাকর তুলনা মুসলিম নারীর ধর্মীয় পরিচয় ও মূল্যবোধের প্রতি তার তীব্র বিদ্বেষ প্রকাশ করে।
বেগম রোকেয়ার দর্শন ইসলামের মৌলিক আকিদা, নবী-রাসূলদের মর্যাদা, শরিয়া আইন এবং ইসলামের বিধানের প্রতি সরাসরি প্রশ্ন করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। যা মূলত ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের একটি জটিল কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো। তার চিন্তাভাবনা প্রগতিশীলতার প্রলেপযুক্ত। যার ফলশ্রুতিতে তার চিন্তাদর্শন মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। একজন মুসলিম নারীর জীবন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য এবং শরিয়া আইনের অধীনে পরিচালিত। যে ব্যক্তি এই তিনটি স্তম্ভকে চ্যালেঞ্জ করে, সেই ব্যক্তি মুসলিম নারীর জীবনের জন্য আদর্শ বা অনুসরণীয় পথপ্রদর্শক কি করে হতে পারে?
রোকেয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার সাহিত্যিক ও চিন্তাভাবনা মূলত পশ্চিমা লিবারেল দর্শন দ্বারা প্রভাবিত, যা মুসলিম নারীর মুক্তি ও মর্যাদার ধারণাকে পুরোপুরি ভিন্ন ফ্রেমে দেখায়। প্রকৃত নারীমুক্তি কেবল স্বাধীনতা বা বিদ্রোহের মাধ্যমে অর্জিত হয় না, এটি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক আনুগত্যের মিশেলে গঠিত হয়।