সম্প্রতি রাজশাহীর তানোরে পরিত্যক্ত গভীর নলকূপে পড়ে ২ বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। এই ঘটনায় কেবল একটি শিশু হারিয়ে যায়নি। বরং, এক মায়ের চোখের সামনে সন্তানের করুণ পরিণতি এবং আমাদের আইনি ও নৈতিক কাঠামোর দুর্বলতা উন্মোচিত হয়েছে। রুনা খাতুন (সাজিদের মা) তার ছোট সন্তানকে কোলে নিয়ে যখন সাজিদের হাত ধরে বাড়ির পাশের মাঠের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন খড় বিছানো গর্তটি যা দুই বছর ধরে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা একটি মৃত্যুফাঁদ তা তিনি বুঝতেই পারেননি। সাজিদ গর্তে পড়ে যাওয়ার পর ভেতর থেকে তার ‘মা মা’ বলে ডাকার মুহূর্তটি এই ঘটনার মানবিক মর্মান্তিকতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

এই দুর্ঘটনার মূলে রয়েছে কছির উদ্দিন মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির চরম দায়িত্বহীনতা। তিনি গভীর নলকূপ বসানোর জন্য গর্ত খুঁড়েছিলেন, কিন্তু দুই বছর ধরে তা বন্ধ না করে অরক্ষিত অবস্থাতেই ফেলে রাখেন। এই গাফিলতি কোনো সাধারণ ত্রুটি না। এটি এক ধরনের মারাত্মক ইচ্ছাকৃত অবহেলা, যা একটি মূল্যবান জীবন কেড়ে নিয়েছে। রুনা খাতুনের আকুল আবেদন, “আমি তার শাস্তি চাই, বিচার চাই”। এটি কেবল একজন মায়ের আর্তি নয়, বরং এটি সেই ন্যায়বিচারের দাবি যা আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রীয় আইন সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত করতে অপারগ। এই সুনির্দিষ্ট ঘটনায় রাষ্ট্রীয় আইন যে পথে অগ্রসর হবে, তাতে ন্যায়বিচারের পরিপূর্ণতা না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

কছির উদ্দিন মণ্ডল পুলিশ দেখেই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়েছে। প্রচলিত আইনে তাকে প্রথমে গ্রেপ্তার করতে হবে, তারপর শুরু হবে দীর্ঘ তদন্ত, মামলা দায়ের এবং বিচারিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া এতই দীর্ঘ হতে পারে যে, রুনা খাতুনের “বিচার চাই” আর্তনাদ বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। রাষ্ট্রীয় আইনের এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচার বা শাস্তি বিলম্বিত করার সুযোগ করে দেয়।

যদি কছির উদ্দিন দোষী প্রমাণিত হনও, তবে রাষ্ট্রীয় আইনে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে কারাদণ্ড বা সামান্য জরিমানা। এই শাস্তি শিশুর জীবন হারানোর সমানুপাতিক না। কারাদণ্ড ভোগ করার পর তিনি সমাজে ফিরে আসতে পারেন, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জীবনে এর কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসে না। রাষ্ট্রের এই বিচারিক প্রক্রিয়া শুধু অপরাধীকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অর্থনৈতিক ও মানসিক শূন্যতা পূরণে ব্যর্থ হয়।

রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে যে ক্ষতিপূরণ (যদি পাওয়াও যায়) তা পেতেও পরিবারকে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়। এই ক্ষতিপূরণ প্রায়শই নামমাত্র হয় এবং এটি কোনোভাবেই সাজিদের ভবিষ্যৎ বা তার বাবা-মায়ের মানসিক কষ্টের মূল্য দিতে পারে না। ন্যায়বিচার এখানে মানবিক সান্ত্বনা দিতে পারে না, বরং প্রশাসনিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই শেষ হয়।

শারিয়াহ আইন ঠিক এই ধরনের ব্যক্তিগত অবহেলা এবং চরম দায়িত্বহীনতার ক্ষেত্রে তার অপরিহার্যতা প্রমাণ করে। এই ঘটনাটিকে শারিয়াহ আইনে ‘কতল আল-খাতা’ (ভুলবশত হত্যা) হিসেবে অত্যন্ত কঠোরভাবে দেখা হতো।

শারিয়াহ আইনে কছির উদ্দিন মণ্ডলের এই দুই বছরের অবহেলাকে কেবল একটি ‘ত্রুটি’ হিসেবে দেখা হতো না, বরং এটিকে একটি গুরুতর পাপ এবং অন্যের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। শারিয়াহর বিধান অনুযায়ী, কছির উদ্দিন মণ্ডলের ওপর সরাসরি দিয়াহ বা রক্তের মূল্য প্রদানের দায় বর্তাতো।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কতলে খাতার (ভুলবশত হত্যার) দিয়াহ বিশটি হিক্কা (৩ বছর বয়সী উট), বিশটি জাযাআ (৪ বছর বয়সী উট), বিশটি বিনতে মাখায (১ বছর বয়সী মাদী উট), বিশটি বিনতে লাবূন (২ বছর বয়সী মাদী উট), বিশটি ইবনে মাখায (১ বছর বয়সী পুরুষ উট)।“[সুনানে ইবনে মাজাহ ,২/২৬২৮]

ঐতিহাসিকভাবে, ১০০টি উটের দিয়াহকে ১০০০ দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা ১০,০০০ দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) এর সমতুল্য ধরা হতো। তবে বর্তমানে, অধিকাংশ ইসলামিক স্কলার এবং আন্তর্জাতিক ফতোয়া কাউন্সিল স্বর্ণের মানদণ্ডকেই অধিক স্থিতিশীল এবং মূল্য সংরক্ষক হিসেবে গ্রহণ করে। সেই হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশি টাকায় কতলে খাতার দিয়াহের আর্থিক মূল্য দাড়ায়, আনুমানিক প্রায় ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা।

শারিয়াহ-র এই দিয়াহ বিধানটি রুনা খাতুনকে দ্রুততম সময়ে আর্থিক ও মানবিক ন্যায়বিচার প্রদান করত। এটি এমন একটি সুনির্দিষ্ট আর্থিক মূল্য যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকত না। এই অর্থ সাজিদের পরিবারকে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনধারণে সাহায্য করত এবং এটি প্রমাণ করত যে, সাজিদের জীবন সমাজের চোখে কতটা মূল্যবান ছিল। এই বিধানের মাধ্যমে বিচার কেবল শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্গঠনের দিকে মনোনিবেশ করতো।

দিয়াহ প্রদানের পর, সাজিদের পরিবার চাইলে কছির উদ্দিনকে ক্ষমা করে দিতে পারতো। এই ক্ষমা (তাওয়াফ আল-দাম)-এর ক্ষমতা ভুক্তভোগী পরিবারকে দেওয়া হতো, যা তাদের আত্মসম্মান ও মানবিক মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করতো। শারিয়াহ আইন এভাবে প্রতিহিংসার পরিবর্তে শান্তি ও সমঝোতার পথ প্রশস্ত করে।

রাষ্ট্রীয় আইন যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তা কছির উদ্দিনের মতো ব্যক্তির নৈতিক অবহেলাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। রাষ্ট্রীয় আইনে একটি নৈতিক শূন্যতা থেকে যায়, যেখানে অপরাধী কেবল আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলতে চায়।

কিন্তু শারিয়াহ আইন, তার দিয়াহ বিধান এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার কঠোর নীতির মাধ্যমে, এই ধরনের ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতাকে সমাজের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে। যদি কছির উদ্দিন মণ্ডল জানতেন যে, তার এই দুই বছরের অবহেলার ফলস্বরূপ তাকে ব্যক্তিগতভাবে এতো বিপুল অঙ্কের আর্থিক দায় বহন করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তাহলে হয়তোবা সেই গর্তটি আর অরক্ষিত থাকতো না।

শারিয়াহ-র মতো একটি নৈতিকভাবে বাধ্যবাধকতামূলক, মানবিক এবং জবাবদিহিমূলক আইন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। এটি আমাদের জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমরা সেদিনের স্বপ্ন দেখি, যেদিন শারিয়াহ-র কঠোর কিন্তু মানবিক বিধানের ছায়ায় আমাদের শিশুরা নির্ভয়ে বেড়ে উঠবে। কারণ তারা জানবে, এই সমাজে তাদের জীবনের মর্যাদা আল্লাহর দেওয়া আমানতের মতো সুরক্ষিত এবং প্রশ্নাতীত।