পুরুষ কিসে আটকায়? কয়দিন পর পরই মানুষের মনে উঁকি দেয় সেই প্রশ্ন। ঘরে শিক্ষিত, সুন্দরী ও প্রেমময়ী স্ত্রী থাকতেও কেন পুরুষের মন স্থির হয় না? কেন পরনারীতে আসক্ত হয়? কিছুদিন আগে আবু ত্বহা মুহাম্মাদ আদনানের তৃতীয় বিয়ের ইচ্ছের কথা জানাজানি হলে, ঠিক এই প্রশ্নটাই বারবার উঠে এসেছিল।

হ্যাঁ, পুরুষ তো নারীতেই আটকায়। কারণ হাদিস থেকেই আমরা জানি, পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় কোনো ফিতনা রেখে যাওয়া হয়নি। কিন্তু এই আটকানো কয়দিনের জন্য? ঠিক কতবার একজন পুরুষ প্রেমে পড়ে—সত্যি সেই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তবে আমি জানি, একজন পুরুষ যখন প্রেমে পড়ে সে কানা, খোঁড়া আর বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। অনেক বুঝ কিংবা যুক্তির কথা তার কানে পৌঁছায় না, সুস্থভাবে সে অনেক কিছুই ভাবতে পারে না। তার খালি মনে হয়, যেকোনোভাবে সেই নারীকে পেতেই হবে।

প্রাসঙ্গিক একটা ঘটনা বলা যেতে পারে। একদিন কাঁদো-কাঁদো হয়ে এক ছাত্রী এসেছিল আমার রুমে। জানালো, পারিবারিকভাবে ভীষণ আর্থিক সমস্যার কারণে সেমিস্টার ফি দিতে পারছে না। তার বিপর্যস্ত চেহারা দেখে জানতে চাইলাম, কোনো বিশেষ সমস্যা হয়েছে কিনা? মেয়েটা মনে হয় নিজের বুকের চাপা কষ্ট খুলে বলার জন্য একজনকে খুঁজে ফিরছিল। কাঁদতে কাঁদতে জানালো: ওর বাবা ওদেরকে ফেলে চলে গেছে। ওরা দু’ ভাই-বোন। ও ভার্সিটিতে পড়ে আর ছোট ভাই পড়ে কলেজে। ওদের মা একজন গৃহিণী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বাবা হুট করেই উধাও হয়ে যাওয়ায় ভীষণ সমস্যার মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে ওদের। অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছে ওর বাবা। আর সেই মহিলার জন্য স্ত্রী, সন্তান ও চাকরি—সব ছেড়ে দূরে চলে গেছে। এমনকি নিজের বাপ-ভাইদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করেছে!

আমি ভাবতে পারছিলাম না, প্রেমের জন্য একজন পুরুষ কতটা স্বার্থপর হতে পারে! কীভাবে পারল, একটা সাজানো সংসার তছনছ করে চলে যেতে? আমার জানা নেই, লোকটি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে, নাকি দেয়নি। কিন্তু যদি তালাকও দেয়, তবুও তা কোন সুন্দর সমাধান নয়। লোকটির প্রথম স্ত্রীর কি হবে! অথচ সে তার যৌবন কালের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো তো তাকেই দিয়ে দিয়েছিল।

এমন পরকীয়া প্রেমের সংখ্যা অগণিত। এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল বলিউডে। ভারতীয় নায়ক ধর্মেন্দ্র প্রেমে পড়েছিল নায়িকা হেমা মালিনীর, অথচ তখন সে ছিল ৪ সন্তানের জনক। হিন্দু ধর্মাবলম্বী ধর্মেন্দ্রের হাতে কেবল একটাই অপশন ছিল—হেমা মালিনীকে স্ত্রী হিসেবে পেতে হলে প্রথম স্ত্রীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটতে হবে। কিন্তু প্রেমে পড়ার কারণে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ইতি টানতে চায়নি ধর্মেন্দ্র। তাই বলা হয়, ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনী দুজনেই ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আসলে এই শ্রেণী-পেশার মানুষের ধর্ম বলতে কিছু আছে কিনা সেটা অবশ্য ভিন্ন এক প্রশ্ন। তাও ভালো—প্রথম সংসার তো ভাঙেনি।

হিন্দু ধর্মের এই সীমাবদ্ধতার দরুন বারবারই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। শুধু একাধিক বিয়ে করার জন্য ধর্ম চেইঞ্জ করার বিষয়টি হিন্দু আইনজীবীদের কাছে ধর্মের জন্য অবমাননাকর মনে হয়েছে। তারা একে বিগ্যামি (দ্বিবিবাহ) হিসেবে গণ্য করে, যা এখন পর্যন্ত হিন্দু আইনে নিষিদ্ধ।

অন্যদিকে ইসলাম ধর্ম পুরুষকে বহুবিবাহের অনুমোদন দিয়েছে। এটা আল্লাহর হিকমাহ। অবশ্যই এতে সমাজের জন্য সার্বিক কল্যাণ আছে, যদিওবা ব্যক্তিগতভাবে তা কারও কারও জন্য কষ্টকর। তবে, এই অনুমতিকে কাজে লাগিয়ে মামুনুল রশিদ কাসেমীর মতো একদল নারীলিপ্সু লোক নিজের খাহেশাত পূরণের জন্য অভাবী ও কমবয়সী মেয়েদেরকে নিজেদের টার্গেট বানিয়েছে। সে বলে বেড়ায় সে নবীর সুন্নত অনুসরণ করছে। আর সে নাকি ভালো চারজন স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে ১০০টাও বিয়ে করবে। এই যে ভালো স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার নাম করে একটা ছেড়ে আরেকটাকে ধরার বিষয়টা কোন সুন্নতে আছে! আর ভালো স্ত্রীর সংজ্ঞাটা কি? স্বামী যা বলবে তা ভুল হোক বা সঠিক হোক বিনা বাক্যে মানবে- সেটাই! মূলত এদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে অল্প মোহরানায় বিয়ে করে কিছুদিন ভোগ করা, আর তারপর তুচ্ছ অজুহাতে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়া। এরা নাকি আবার নাকি নারীদের উদ্ধার করতে নেমেছে! অথচ যেই সমাজে একটি কুমারী মেয়ের বিয়ে দেয়াটা বাবার জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ, সেখানে এদের ছেড়ে দেওয়া তালাকপ্রাপ্তা নারীদের কে বিয়ে করবে!

সত্যি বলতে, সাহাবীদের সমাজ তো আমাদের মতো ছিল না। সেখানে বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন থাকায় কোনো নারীকেই অবিবাহিত অবস্থায় পড়ে থাকতে হয়নি। প্রতিবেশী হিন্দু রাষ্ট্র ও পশ্চিমা বাতাস লাগা এই বাংলায় নবী ও সাহাবীদের সুন্নাহর চর্চা খুব কম। আছে কেবল ছাড়াছাড়ি ও বাড়াবাড়ির সয়লাব। ইসলাম বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি—কোনোটাকেই সমর্থন দেয় না। ইসলাম সমর্থন দেয় না, আল্লাহর আইনকে অবজ্ঞার চোখে দেখতে, নিশ্চয়ই তা ঈমানবিধ্বংসী; কিংবা আল্লাহর আইনকে কৌশলে নিজের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মাধ্যম বানাতে।