‘এনগেজমেন্ট বা বাগদান’ হলো বিবাহ-পূর্ব একটি অঙ্গীকার, যা দুটি পরিবার এবং একে অপরের প্রতি সম্মতি প্রকাশ করে। এর অর্থ হলো বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ এবং বিবাহের মধ্যবর্তী সময়ের একটি অবস্থা। তবে, হাদিস অনুসারে, এই সময়েও একজন নারী অপরের জন্য ‘পরনারী’ হিসেবেই গণ্য হয় এবং এসময়ে একান্ত নির্জনে যোগাযোগ ও সময় কাটানো ইসলামে পুরোপুরি নিষিদ্ধ৷
আমাদের দেশে বিয়ের খুব কমন একট কালচার হল, ছেলে-মেয়ের যদি নিজের পছন্দ থাকে, সেক্ষেত্রে দুই পরিবার বিয়ে না পড়িয়ে ‘engagement’ করিয়ে রাখেন। এরপর ২-৩ মাস, ৬ মাস বা ১ বছর পর বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘এংগেইজমেন্ট’ ব্যাপারটা হল, ‘এতদিন ছেলে-মেয়ে লুকিয়ে হারাম সম্পর্কে ছিল, এংগেইজমেন্ট এর পর প্রকাশ্যে হারাম সম্পর্কে আবদ্ধ হল।‘
আমার কথা খুব কটু লাগলে নিজেই চিন্তা করুন তো:
এংগেইজমেন্ট করানোর পর পাত্র যদি মারা যায়, পাত্রী কি ইসলামের বিধান মোতাবেক ৪ মাস ১০ দিন স্বামীর জন্য শোক পালন করতে পারবে? না, পারবে না৷ তাহলে এই এংগেইজমেন্ট এরও কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই৷ এতটুকু বুঝার জন্য খুব বেশি জ্ঞানী হতে হয় না৷
কেউ যখন লুকিয়ে গুনাহ করে, তখন সেটা গুনাহের ও আল্লাহর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। গুনাহগার ব্যক্তিটি আল্লাহর কাছে তওবা করলে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দিতে পারেন।
কিন্তু কেউ যখন প্রকাশ্যে গুনাহের কাজ করে। সেই একই গুনাহের কাজটি পরবর্তীতে পরিবার ও সমাজের অনেকেই করে ফেলতে পারে। এতে পরিবার ও সমাজে গুনাহের পরিমাণ বেড়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়ে যায়৷
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে বলতে শুনেছি যে, আমার সকল উম্মাতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারী ব্যতীত। আর নিশ্চয় এ বড়ই অন্যায় যে, কোন লোক রাতের বেলা অপরাধ করল যা আল্লাহ গোপন রাখলেন। কিন্তু সে সকাল হলে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটাল যে, আল্লাহ তার কর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার উপর আল্লাহর দেয়া আবরণ খুলে ফেলল। [মুসলিম ৫৩/৮, হাঃ ২৯৯০]
জরুরি প্রয়োজনে এংগেইজমেন্ট হলেও তা যতসম্ভব সংক্ষিপ্ত রাখা:
-
অনেক সময় দেখা যায় বিয়ের আগে পাত্রীকে দেখতে এসে পাত্রপক্ষ পাত্রীকে পছন্দ করে উপহার হিসেবে ক্যাশ টাকা উপহার দিয়ে যান বা আংটি পরিয়ে দেন।
এই দেখাসাক্ষাতের সময়ই নিকটবর্তী কোনো দিনে বিয়ের দিন-তারিখ ধার্য করে ফেলা যায়৷ -
কোনো পাত্র হয়তো প্রবাসে থাকে। অনলাইনের মাধ্যমে বিয়ের জন্য পাত্রী পছন্দ করে বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়েছে। পাত্র দেশে আসার আগে দুই পরিবারের সম্মতিতে পাত্রীকে একটা আংটি পরিয়ে রাখা হল৷ এতে করে পাত্রীপক্ষ দ্বিধামুক্ত থাকেন৷
কিন্তু আংটি পরানোর নাম করে বা ঘটা করে এংগেইজমেন্ট করিয়ে বিয়ে পড়ানোয় বিলম্ব করা অনুচিত৷ এই এংগেইজমেন্ট পিরিয়ডে পাত্র-পাত্রীর অবাধ মেলামেশা বন্ধ রাখা উচিত৷
বিয়ের সুন্দর ২ টা ঘটনা শেয়ার করি আপনাদের সাথে:
ঘটনা ১: আমার এক বান্ধবীর খালা আছেন। সেই খালা যখন জানতে পারলেন যে, উনার ছেলে প্রেম করে৷ উনি সেই প্রেমিকার সাথে ছেলের বিয়ে দিয়ে দেন৷ ছেলে আর মেয়েটা তখন মনে হয় ভার্সিটি সেকেন্ড ইয়ারে পড়তো৷
সেই খালা নাকি বলেছিলেন, এই বয়সে প্রেম করতে পারলে বিয়েও করতে পারবা।
মাশা আল্লাহ। আল্লাহ উনাদের হালাল সম্পর্কে বারাকাহ দিন, আমীন।
ঘটনা ২: কন্যা যখন টিনেজার, মা তখন থেকেই কন্যার জন্য নেককার জীবনসঙ্গী পাবার দু’য়া করতেন৷ কন্যার বয়স যখন ২২, তখন থেকেই তার জন্য মা বিয়ের প্রপোজাল দেখা শুরু করেন৷
কন্যা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েও কিভাবে নিকাব, বোরখা পরা শুরু করে, এ নিয়ে পাত্রপক্ষ’র প্রশ্নের শেষ নেই!! ২৫+ বয়স হয়ে যায় কন্যার কিন্তু বিয়ের কোনো প্রপোজাল ই আগায় না।
আল্লাহর দয়ায় হঠাৎ এক দ্বীনদার পাত্র পান উনারা৷ পাত্র সৌদি বড় হয়েছে। এখন দেশে নিজের বিজনেস করে৷ বিয়ের কথাবার্তা চলার সময় পাত্রপক্ষ নিজের বাড়িতে পাত্রীপক্ষকে দাওয়াত করে খাওয়ান। পাত্রীপক্ষ’র বাড়িতে পাত্র দাওয়াতের আয়োজন করতে দেন নি। মসজিদে কাবিন হবার পর পাত্র তার নিজের বাড়িতে পাত্রীকে নিয়ে চলে যান। এরপর ওয়ালিমার আয়োজন করেন৷ পাত্রীপক্ষকে কোনো খরচ করতে দেন নি। মাশা আল্লাহ৷
পরিবারে উচ্চ শিক্ষিত বাবা, মা, বড় ভাই-বোন থাকলেই শুধু হবে না, আল্লাহ যেন আমাদের মুরুব্বিদেরকেও ইসলামের বিধান মোতাবেক জীবন গড়ার তৌফিক দেন ইনশা আল্লাহ, আমীন।
নোট: (রাসূলুল্লাহ (সা:), ছাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের যুগে বাগদানের আংটি পরানো বা বিনিময় করার বিষয়ে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। বরং এটা খ্রীষ্টানদের ধর্মীয় রীতি, যা তাদের মধ্যে চলমান রয়েছে (উছায়মীন, আল-লিকাউশ শাহরী ১/৪৬; মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৮/১১২; ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব ২/২২)।
আর মুসলমানদের জন্য অন্য ধর্মের রীতি অনুসরণ করা বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’ (আবূদাউদ হা/৪০৩১; মিশকাত হা/৪৩৪৭, সনদ ছহীহ)।
তবে সাধারণভাবে মেয়ে দেখতে গিয়ে পছন্দ হলে বা না হলেও হাদিয়া স্বরূপ যেকোন জিনিস, বই বা নগদ অর্থ দেওয়া যায় (ইবনু তায়মিয়াহ, আল-ফাতাওয়াল কুবরা ৫/৪৭২)।
উল্লেখ্য যে, বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত পাত্র-পাত্রীর মধ্যে অবাধ আলাপচারিতা বৈধ নয় (ছালেহ আল-ফাউযান, আল-মুনতাকা ৩/১৬৩)- মাসিক আত তাহরীক)