নিজের হিসাব নিজে নিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। সম্পদ, টাকা পয়সা, প্রতিপত্তি কিছুই না- একটা ভূমিকম্প আমাদের কিছুটা হলেও বুঝিয়ে দিয়েছে আশা করছি।

সালাতের সময় কি সলাত আদায় করা হয়েছে? নাকি হয় নাই? আল্লাহের হক আদায় করলেও, বান্দার হক কি ঠিক রেখেছি? কারো হক কি মেরে খেয়েছিলাম? আজকে যে ভবনে বাস করছি কারো হকের জায়গা দখল করে তৈরী করি নাই তো?

আমাদের কি কারো কাছে দেনা আছে? স্বামী হিসেবে কি স্ত্রীর হক দিচ্ছি অথবা স্ত্রী হিসেবে স্বামীর? বাবা মা, রক্তের সম্পর্কের হক কি ঠিক আছে? এই সকল প্রশ্নের সাথে সাথে নিজেদের আরো প্রশ্ন করা উচিত নিজেদের অন্তর, নফস কে কি খারাপ প্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা আমরা করছি? নাকি প্রবৃত্তি যা চায় তাই তাকে দিয়ে ঠাণ্ডা করি!

মানুষ এখন যতটা স্বার্থপর হয়েছে এর আগে এরকম ছিল কি না আমি সন্দেহ করি। নিজেদের কে কোনো একটা জায়গায় তোলার জন্য বা কোনো একটা কাঙ্খিত সাফল্যের জন্য নিজের জন্ম দাতা পিতা মাতাকেও সিঁড়ির মত ব্যবহার করে। যখন ব্যবহার শেষ তখন বৃদ্ধাশ্রমে হয় তাদের ঠাঁই! নার্সিসিস্টিক আচরণ চারিদিকে।

“Narcissistic” এর বাংলা অর্থ হলো আত্মমুগ্ধ অথবা আত্মকেন্দ্রিক। এর দ্বারা এমন একজন ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যার মধ্যে নিজের প্রতি অতিরিক্ত মুগ্ধতা, আত্ম-গুরুত্বের স্ফীত অনুভূতি, এবং অন্যদের প্রতি সহানুভূতির অভাব থাকে।

আত্মমুগ্ধতা (Self-admiration): নিজের গুণাবলী সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণ করা এবং নিজের প্রতি অতিরিক্ত মুগ্ধ থাকা। নিজের প্রতি আকর্ষণ এবং অন্যদের প্রতি সহানুভূতির অভাবকে বোঝায়। আত্মকেন্দ্রিক (Self-centered): নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত ভাবা এবং অন্যদের প্রয়োজন বা অনুভূতিকে কম গুরুত্ব দেওয়া।

একটু চারিদিকে খেয়াল করেন- নারী, পুরুষ, ছেলে, মেয়ে সবার মধ্যে এই প্রবণতা। যাদের মধ্যে কিছুটা সহমর্মিতা বাকি আছে তাদের মনে করা হচ্ছে “বোকা”! যারা নিজেদের আগে অন্যের জন্য আগ বাড়িয়ে কোনো কাজ করে দিচ্ছেন বা স্যাক্রিফাইস করছেন হোক সেটা কোনো গৃহিণী তার সংসারের জন্য অথবা কোনো গৃহকর্তা তার পরিবারের জন্য- তাদের প্রত্যেকটা প্রচেষ্টা কে taken for granted নেওয়া হচ্ছে! তখন এই অপরের জন্য নিবেদিত মানুষগুলো নিজেকে মূল্যহীন বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই যে অস্থির একটা সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা পার হচ্ছিলাম! ভূমিকম্প টা আমাদের জন্য একটা রিমাইন্ডার হিসেবে আসলো। যে সমাজে পরকীয়া একটা ছেলে খেলার মত বিষয় হয়ে গেছে, অশ্লীলতার ছড়াছড়ি চারিদিকে! ইন্টারনেটে নীল পর্দায় আসক্ত যুব সমাজ থেকে প্রৌঢ় সমাজ! যেখানে মুসলিমের মুখ থেকে বের হয় “ইসলামী শরীয়ত চাই না!” অথবা ইসলামী শরীয়ত কে ভয় পায়! সম*কামীতাকে প্রমোট করার যারপর নাই চেষ্টা চলে! আর মুসলিম নামধারী বেশ কিছু মানুষ বলে “এতে অসুবিধা কই? এটা ব্যক্তি স্বাধীনতা!” বাংলাদেশের রিপ্রেজেন্টার হিসেবে একজন উলংগ নারীকে ভোট দিয়ে দেশের সম্মান বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়!

তখন আসলে আশ্চর্য হই না, কেন অনেক বড় আযাব এই দেশের উপর আসলেও আসতে পারে। নবী ﷺ অশ্লীলতা (ফাহিশা) সমাজে ছড়িয়ে পড়লে আজাব নাজিল হওয়ার ব্যাপারে কয়েকটি সহিহ হাদিসে সতর্ক করেছেন। নিচে হাদিসগুলো দেওয়া হলো:

১. অশ্লীলতা প্রকাশ্য হলে আল্লাহর আজাব আসে

সহিহ ইবন মাজাহ- হাদিস ৪০১৯

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“যখন কোনো জনগোষ্ঠীতে অশ্লীলতা (ব্যভিচার/অশ্লীলতা) প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে যে রোগ ও ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে তা এমন যা তাদের পূর্ববর্তী লোকদের মধ্যে ছিল না।”

২. পাপ প্রকাশ্যে করলে শাস্তি সাধারণে নেমে আসে

সুনান আত-তর্মিজি – হাদিস ২১৬৮ (হাসান)

নবী ﷺ বলেন:

“যখন কোনো সম্প্রদায়ে অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা প্রকাশ্যে তা করতে থাকে, তখন আল্লাহ সবার উপর এমন শাস্তি পাঠান যা শুধু অপরাধীদের নয়, সকলকে আঘাত করে।”

৩. সমাজে ফিতনা ও দুর্নীতি ছড়ালে আযাব সবার উপর আসে

সহিহ বুখারি- হাদিস ৭১০৮

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“আল্লাহর শাস্তি যখন আসে, তখন তা সৎ-অসৎ সকল মানুষের উপর নেমে আসে; তারপর প্রত্যেককে তার নিয়ত অনুযায়ী পুনরুত্থানের দিনে উত্থিত করা হবে।”

মুসলিম হিসেবে আমাদের সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ জারি রাখতেই হবে। তানাহলে শনিবার ওয়ালাদের মত বানর, শুকরে পরিণত হবার আযাবে আমরা চুপ থাকার জন্যও পড়ে যেতে পারি!

কারা ছিল এই শনিবার ওয়ালারা?

সূরা আল-বাকারা ২:৬৫, সূরা আল-আ’রাফ ৭:১৬৩–১৬৬ এ আমরা পাই, আল্লাহ বনি ইসরাইলের এক জনগোষ্ঠীকে আদেশ করেছিলেন- শনিবার দিনে কোনো ধরনের শিকার করা যাবে না।

কিন্তু তাদের পরীক্ষার জন্য শনিবারে প্রচুর মাছ পানির ওপরে এসে যেত, আর অন্যদিন প্রায় থাকত না।

তখন জনগণের একটি দল ধূর্ত উপায় বের করল:

শনিবার মাছকে ফাঁদে আটকে রাখত, আর রবিবার ধরে নিত। বাহ্যত আদেশ মানার ভান, আসলে অবাধ্যতা।

তিন দলের আচরণ:

আলেমগণ বলেন, সেই সমাজ তিন দলে বিভক্ত হয়েছিল:

১) পাপকারী দল

শনিবার মাছ ধরা বন্ধ করল না- চাতুরী করে নিয়ম ভাঙল।

২) নিষেধকারী দল

তারা বলত:

“আল্লাহকে ভয় করো! এটা করবে না!”

তারা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করল।

৩) নীরব দর্শক দল

তারা বলল:

“এদের নিষেধ করে কী হবে? আল্লাহ তো শাস্তি দেবেনই…”

আল্লাহ বলেন:

“তারা যখন নিষেধ করা বিষয়ের উপর জেদ ধরে দাঁড়িয়ে রইল, তখন আমি বললাম: ‘হও অপদস্থ বানর!’ (আল-আ’রাফ ৭:১৬৬)

এখানে শিক্ষাটি কী?

১) মন্দ কাজ নিষেধ করা না করলে সমষ্টিগত শাস্তি নেমে আসে

হাদিসে নবী ﷺ বলেন:

“যখন কোনো সমাজে পাপকে দেখে কেউ প্রতিরোধ না করে, তখন শীঘ্রই আল্লাহ সবার উপর সমষ্টিগত শাস্তি পাঠান।”

— সুনান আত-তিরমিযি, হাদিস ২১৬৮

২) ‘নিষেধকারী’ দলই রক্ষা পেয়েছিল

আল-আ’রাফে ইঙ্গিত আছে—

যারা নিষেধ করেছিল তারা রক্ষা পেয়েছিল, আর যারা নিষেধ করেনি তারা শাস্তি পেয়েছিল—even if they personally didn’t do the sin.

৩) শুধু নিজে সৎ হওয়া যথেষ্ট নয়

ইসলাম চায়— নিজে সৎ হও, অন্যকে সৎ কাজের দিকে ডাকো। মন্দ কাজে সতর্ক করো। এটাই উম্মাহ’র দায়িত্ব।

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজ নিষেধ: শক্তিশালী নীতি

কুরআন বলে:

“তোমরা মানুষদের জন্য উদ্ভূত সেরা উম্মাহ — তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ নিষেধ করো।”

(আল ইমরান ৩:১১০)

আমরা আমাদের দায়িত্ব থেকে দূরে সরে গিয়েছি। না নিজে নিজেদের পাপ কাজের হিসাব রাখি আর না পাপ কাজে বাঁধা দেই! পশ্চিমারা আমাদের বুঝাতে সফল হয়েছে যে, পাপ কাজে বাঁধা দেওয়ায় অনধিকার চর্চা প্রকাশ পায়। যে করছে তার ব্যাপার! আর আমার মনস্তাত্ত্বিক ও মতাদর্শিক আগ্রাসনের শিকার জাতি সেটাই ভালো মনে করি যা তারা (পশ্চিমারা) ভালো মনে করে; আর তাই খারাপ মনে করি যা তারা (পশ্চিমারা) খারাপ মনে করেন।

আল্লাহ্ আমাদের দ্বীনের সঠিক বুঝ দেন, জ্ঞান দেন ও নিজের জীবনে আমল করার তৌফিক দেন। মৃত্যুর আগে নিজের হিসাব নিজে নেওয়ার তৌফিক দেন। আত্ম অহংকার নয় বরং আত্ম সমালোচনার মনমানসিকতা দেন। নিজের চারিত্রিক উন্নতিতে মনোযোগী হবার তৌফিক দান করেন। মুসলিম হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব- সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করার তৌফিক দান করেন। তাহলেই আমরা আশা করতে পারি, হঠাৎ বিপদে পড়লেই আল্লাহের নাম উচ্চারণ করা জাতি বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে, আল্লাহের আযাব থেকে রক্ষা পাবে। إن شاء الله