মনে করুন, ক্লাসের ২০ জন বাচ্চাকে সবার সামনে এক এক করে দাঁড় করানো হলো। প্রথমে একটা মেয়ে আসল, ওকে টিচার বলল, তোমার হাঁটার স্টাইলটা ভালো না।

এরপর আরেকটা মেয়ে আসল, ওকে বলা হল, তোমার চুলগুলো উসকো-খুসকো। গায়ের রঙ চাপা।

তিন নম্বরে এলো একটা ছেলে বাচ্চা। ওকে বলা হলো, তোমার ঠোঁট ফাটা। কেমন ছাইরঙা কাপড় পরেছ, ভালো দেখাচ্ছে না।

চার নম্বরকে বলা হলো, তুমি বেশি বেটে। কথাও বলো আস্তে আস্তে, কোনো কনফিডেন্স নাই।

এই ক্লাস টিচারকে কি ধরে পেটাতে ইচ্ছা করবে না?

এই ব্যক্তি কি রিয়েলি টিচার হওয়ার যোগ্য?

ক্লাসে এসে যে বাচ্চাদের হাইট, স্কিনকালার, হাঁটার স্টাইল, কথা বলার স্টাইল, কাপড়ের ডিজাইন নিয়ে কথা বলে, তার শিক্ষার মান এবং মূল্যবোধ কতটুকু?

কিন্তু এই আজব টিচারকে বিরক্ত লাগলেও, বিউটি কনটেস্ট বিষয়টা পুরো জাতি কীভাবে কীভাবে যেন উপভোগ করে।

যেখানে বিচারকের আসনে বসা একদল নারীপুরুষ অলমোস্ট এসব কথাই বলে, এসব জিনিসই জাজ করে।

কে কত লম্বা

কে কত সুন্দর

কে কত ফিট

কে কত স্টাইলিশ

কে কীভাবে হাঁটে

কে কীভাবে কথা বলে

কে কীভাবে হাসে

সারা দুনিয়াকে ওয়েস্ট শেখায়, কাউকে জাজ করবা না।

বিউটি কামস ইন অল শেইপস অ্যান্ড ফর্মস।

সবাই বিউটিফুল।

কিন্তু কী প্রহসন।

নিজেরাই বিউটি পেজেন্ট এর নামে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করে। যেখানে ঠিক এই কাজগুলোই করা হয়।

আগেকার দিনে বিয়ের কনে দেখতে এসে যেভাবে পাত্রপক্ষের মা-বোনেরা পাত্রীকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যাচাই করত।

একটু হেঁটে দেখাও তো।

চুলটা খুলে দেখাও তো।

দাঁতগুলো কেমন দেখি।

হাতের রঙের সাথে মুখের রঙটা মিলেছে কিনা দেখি।

কনে দেখার এই বিশেষ কায়দাকে যারা “ছোটলোকি” মনে করে, তাদের মতেই কিন্তু বিউটি পেজেন্ট এক বিরাট সভ্যতা আর সংস্কৃতির নাম। সেই বিউটি পেজেন্ট, যা কিনা গরুর হাটে গরু তোলার মতোই মেয়েদেরকে স্টেইজে তোলে। পাত্রপক্ষের মতোই তাদেরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জাজ করে। ঘোমটা খুলে চুল দেখাতে বলেনা, পুরো শরীরটাই দেখার দাবি করে।

কে স্লিম, কে বোল্ড, কে কত বেশি পারফেকশনের সাথে শরীরটা সবার সামনে প্রেজেন্ট করতে পারে। সবকিছু ধরে ধরে জাজ করে।

মোটা, বেটে, কিংবা দশজনের মতো সাধারণ দেখতে মেয়েরা এসব বিউটি কনটেস্টে চান্স পায় না।

কেন? তারা কি ‘সুন্দর’ নয়?

মিস পাকিস্তান নামের এক কনটেস্ট্যান্টকে এবার অনেক ট্রল করা হচ্ছে, কারণ সে সামান্য হেলদি। মাইন্ড ইট, সে “সামান্যই” হেলদি। এরচেয়ে বেশি হেলদি হলে কিন্তু বিউটি পেজেন্টে অংশ নেয়ার সুযোগই পেত না।

কেন এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড?

যেসব মেয়েরা এখানে অংশ নেয়, তারা গাধার খাটুনি খেটে দিনরাত ডায়েট আর এক্সারসাইজ করে। যেন একটা নির্দিষ্ট মাপের ভেতর তারা ফিট করতে পারে। খেয়াল করে দেখবেন, যারা বিউটি পেজেন্টে আসে, সেসব মেয়েদের চেহারা ঢেকে দিলে সবাইকে একই রকম লাগছে। কারণ তাদের শরীরের রেশিও বেধে দেয়া হয়, তাদের পরার পোশাক ঠিক করে দেয়া হয়, তাদের চুল, চেহারা সব কিছুতে অনেক কারসাজি করতে হয়।

যদি সত্যি বিউটি কামস ইন অল শেইপস অ্যান্ড ফর্মস কথাটায় ওরা বিশ্বাস করে, তাহলে কেন নিজের স্বাভাবিক দেহটা নিয়ে সামনে আসে না?

কেন তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশের মাপ একটা নির্দিষ্ট মাপের বাইরে যেতে দেয়া চলবে না?

কেন তারা কড়া মেইক আপ না করে সাধারণ চেহারায় থাকে না?

কেন তাদেরকে কম্পিটিশনের বেধে দেয়া পোশাকই পরতে হয়, আবার মানুষের কথামত পোশাক খুলেও নিজেকে দেখাতে হয়?

কেন বিকিনি পরে নগ্নপ্রায় দেহ প্রকাশ না করলে তাদের নম্বর কাটা হয়?

এইসব কি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড না?

এগুলো কি মেয়েদের উপর জুলুম না?

এই উদ্ভট, কষ্টদায়ক, নিয়ম-কানুনের বোঝাগুলো কি মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে না?

এসব নিয়ম-কানুন না মানলে কোনোভাবেই কনটেস্ট্যান্টরা কম্পিটিশনে টিকতে পারবে না।

আবার এত কষ্ট করার পরেও— গা থেকে জামাখুলে ফেলা, হাইহিল পরে বেঁকে-তেরে হাঁটা, দিনের পর দিন স্ট্রিক্ট ডায়েট, এক্সারসাইজ করে বডিকে শেইপে রাখা, মাসের পর মাস ফ্যামিলি থেকে দূরে থাকা, লাইফের সবকিছুকে সাইডে রেখে শুধু এই কম্পিটিশনকেই নিজের ধ্যান-জ্ঞান এবং একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত করা— এতকিছুর পরেও ডার্টি পলিটিকস আর আনফেয়ার লবিয়িং এর কারণে বেশিরভাগ মেয়েই জিততে পারবে না।

আর যারা জিতবে, তাদের মাথায় একটা ক্রাউন পরিয়ে শুরু হবে নতুন ব্যবসা।

এবার তাদের দেহ দেখিয়ে বিজনেস ম্যাগনেটরা নিজেদের প্রডাক্ট সেল করবে, নিজের বিজনেসের রেভেনিউ বাড়াবে, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কামাই করে নিজেরা নিজের লাক্সারিয়াস লাইফে পরিবার নিয়ে শান্তিতে বসবাস করবে।

মেয়েগুলোকে ইউজ করা হবে পণ্যের মতো।

লাইক এ ম্যানেকিন, রক্তমাংসের ম্যানেকিন, যাকে যেভাবে খুশি চালানো যায়, যা খুশি পরানো যায়, যা খুশি করানো যায়।

সেক্সুয়াল অবজেক্টের থেকে বেশি কিছুই না এই মেয়েগুলো। যাদের ফ্যামিলি লাইফ বলে কিছু থাকতে পারবে না। যারা বাচ্চা নিয়ে ফিগার নষ্ট করতে পারবে না। তাহলেই তার এত-কষ্টে-অর্জিত স্থান দখল হয়ে যাবে।

এটা যদি জুলুম না হয়, তাহলে জুলুম কী আসলে?

আমরা কি মেয়েদেরকে শুধু মুখেই বলব, এভরিওয়ান ইজ বিউটিফুল। আর বাস্তবে ফিতা বেধে একটা অমানুষিক স্ট্যান্ডার্ড সেট করে বলব, এর বাইরে একচুল গেলেই তুমি কুৎসিত, তুমি বাদ।

মনে মনে হাজারো মেয়ে তখন এই অমানুষিক, অস্বাভাবিক দেহটা পাওয়ার স্বপ্ন দেখবে। নিজের সাধারণ শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে কমতি মনে করবে। বাহ্যিক ইমপারফেকশন নিয়ে হীনমন্যতা আর ডিপ্রেশনে ভুগবে।

হাজারো পুরুষ বিশ্বাস করতে শুরু করবে, সুন্দরী মানেই একটা বিশেষ শেইপের নারী। ঘরের স্ত্রীকে তাদের ভীষণ অসুন্দর, ভীষণ অযোগ্য মনে হবে।

শাশুড়িরা বউ খুঁজতে গেলে পাত্রীদের মধ্যে এসব আরোপিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞাই খুঁজবে। কোনো পুরুষ ভুলেও সাধারণ, সাদামাটা দেখতে কোনো নারীকে বিয়ে করতে চাইলে তাকে পরিবার থেকে বাধা দেয়া হবে।

বাচ্চা মেয়ে, কিশোরী যারা এই সংজ্ঞায় নিজেকে ফিট করাতে পারবে না, তাদেরকে অন্য ছেলেমেয়েরা বুলি করবে। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাগুলোর মনে তৈরি হবে ট্রমা, বাহ্যিকভাবে সুন্দর হওয়ার অস্বাভাবিক কম্পিটিশন।

চেইন রিঅ্যাকশনের মতো সমাজে এই দুষ্টচক্র চলতে থাকবে।

বিউটি পেজেন্ট মানে শুধু একটা নিরীহ কম্পিটিশন না। নিছক বিনোদন না।

বিউটি পেজেন্ট মানে প্রচণ্ড নোংরা একটা মেন্টালিটিকে সমাজে স্বাভাবিক করে তোলা।

যেখানে মেয়েদের পোশাক নিয়ে কথা বলার বৈধতা দেয়া হয়। মেয়েদের শরীরকে জাজ করার লাইসেন্স দেয়া হয়।

যেখানে নারীদেহকে যৌনতার লেন্স দিয়ে দেখানো হয়। যেখানে নগ্নতা আর পোশাক খুলে নাচাকে বলা হয় ‘সাহসিকতা’ আর ‘কনফিডেন্স’।

সভ্যতার নামে, স্বাধীনতার নামে, বিনোদনের নামে, নারীদেরকে পণ্যের মত ব্যবহার আর কত?