তুমি তো খালি বাসায় বসে খাও আর ঘুমাও।
বাইরে কাজ করলে টের পাইতা কত ধানে কত চাল।
এই কথাগুলো অনেক পুরুষই তাদের স্ত্রীকে বলে থাকেন। কথাগুলো স্ত্রীদের জন্য খুবই অপমানজনক। সারাদিন স্ত্রী ঘর সামলায়, সংসারের সবকিছু পরিপাটি করে রাখে, স্বামীর জন্য যত্ন করে খাবার তৈরি করে, বাচ্চাকাচ্চা থাকলে তাদের দেখাশোনা করে, অনেক স্ত্রী আছে যারা স্বল্প আয়ের সংসারে পাই পাই হিসাব করে খরচ করে যেন স্বামীর টাকা এক ফোটাও অপচয় না হয়। অর্থাৎ স্ত্রী সেই সব জরুরি “সার্ভিস” গুলো করে, যা সে বাদে অন্য কেউই তার মত মায়া ও ভালোবাসা নিয়ে করতে পারবে না। সংসারে তার স্থানকে কেউই পূরণ করতে পারবে না।
চিন্তা করে দেখুন, আপনি যখন ছোট ছিলেন, আপনার পরিবারে মায়ের উপস্থিতি ছিল না, এমন দিন ঠিক কতবার দেখেছেন? আপনার জীবনে মায়ের ভূমিকা কেমন ছিল? স্বামী-সন্তান-সংসারের পিছে আপনার মায়ের অবদান কতখানি?
আপনার মা যেমন সংসারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন, বর্তমানে আপনার স্ত্রী ঠিক একই ভূমিকা পালন করছে। তাই স্ত্রীর কাজগুলোকে কখনোই অবমাননা করবেন না, মানুষের সামনে বিশেষ করে সন্তানদের সামনে তাকে ছোট করবেন না। এমনকি ঘরের ভেতরেও তাকে এমন ধরনের অপমানজনক কথা বলবেন না যা তাকে আপনার প্রতি বিষিয়ে তোলে।
আল্লাহ তা’আলা পুরুষকে ‘কাওয়াম’ বা কর্তৃত্বশীল হিসেবে মনোনীত করেছেন। একই সাথে পুরুষকে দিয়েছেন ভরণপোষণের দায়িত্ব। কাজেই এই যে আপনি বাইরে যাচ্ছেন, কষ্ট করে অর্থ উপার্জন করছেন, পরিবারের আর্থিক সুবিধা-অসুবিধাগুলোর দেখভাল করছেন, এটা আপনার উপর আপনার স্ত্রী চাপিয়ে দেয় নি, বরং এটা পুরুষদের জন্য আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব।
নারীদের উপর অর্থ উপার্জনের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই তাকে বাইরে কাজ করার মর্ম বোঝাতে গিয়ে অর্থ উপার্জনের খোটা দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটা তো পুরুষেরই কাজ। ঘরে নারীরা তাদের কাজ করবে। সন্তান জন্মদান, প্রতিপালন, ঘর-সংসার সামাল দেয়া তার দায়িত্ব। আল্লাহ তা’আলা নারীদেরকে স্ত্রী এবং মা হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন, বাকি সব কাজের উপরে।
স্ত্রীকে যদি তার দায়িত্বগুলো যথাযথ পালনে সচেষ্ট থাকে, তাহলে তাকে মনখুলে প্রশংসা করুন। বিশেষ করে এই যুগে, যখন নারীরাও পশ্চিমা চালচলন দ্বারা এতটাই ব্রেইনওয়াশড যে ক্যারিয়ার ছাড়া, নিজের চাকরি, নিজের সফলতা ছাড়া কিছু ভাবতেই চায় না। অনেক নারীই আছে, যাদেরকে জোর করেও বাচ্চা নেয়ার ব্যাপারে রাজি করানো যায় না। অনেক নারী আছে, যারা দুই বেলা রান্না করতে ইচ্ছুক না। ঘরের কাজ করাকে ‘বোঝা’ মনে করে। এই যুগে যদি আপনি সংসারী এবং আপনার প্রতি মনোযোগী স্ত্রী পেয়ে থাকেন, তাহলে আপনি সৌভাগ্যবান। কাজেই আপনার স্ত্রীকে বলুন, তুমি আছো বলেই আমি শান্তিতে বাইরে খাটতে পারি। তুমি বাচ্চাদের দেখাশোনা করো বলে আমি নিশ্চিন্ত থাকি। তোমার কারণেই আমার সংসারটা আজ এত চমৎকার। দেখবেন, স্ত্রী তার কাজে আরো উদ্যম খুঁজে পাবে। আপনার প্রতি তার সম্মানও বেড়ে যাবে বহুগুণে।
স্ত্রীর দায়িত্বে অবহেলা বা ভুলত্রুটি থাকলেও তাকে বুঝিয়ে বলুন। অপমান বা কটাক্ষ করে নিজেকে ‘মহান’ প্রমাণ করতে যাবেন না। এতে হিতে বিপরীত হবে। স্ত্রী আপনার প্রতি সম্মান হারাবে এবং মনে মনে ভাববে, বাইরে কাজ করলে এবং অর্থ উপার্জন করলেই আমি ‘বেটার’ হতে পারব। সে সুযোগ খুঁজতে থাকবে কীভাবে একটা উপার্জনের পথ তৈরি করা যায়, আস্তে আস্তে সংসারের প্রতি মনোযোগ হারাবে। আমরা অবশ্যই কারো ভেতর এই মানসিকতা তৈরি করতে চাইনা। আমরা চাই একজন নারী তার সত্যিকার “ভ্যালু” বুঝুক। একজন নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তার স্বামী। স্বামী যখন তার স্ত্রীকে সম্মান করে, স্ত্রীর কাজগুলিকে গুরুত্ব দেয়, প্রশংসার নজরে দেখে, তখন সে আপনা-আপনি নিজের স্ত্রী হওয়ার মর্যাদা বুঝতে পারে। সে টাকা কামাই করে বা অফিসের প্রোমোশন দিয়ে নিজের দাম খুঁজতে যায় না।
কাজেই নারীদের নারীত্বের প্রশংসা করুন। স্ত্রীর নারীসুলভ আচরণকে একসেপ্ট করতে শিখুন। আপনার জন্য যত্ন নিয়ে তার সাজা বা রান্না করাকে আলাদাভাবে অ্যাপ্রিশিয়েট করুন। নিজের ঘরকে শান্তির নীড় বানান। সবদিক থেকে স্ত্রীকে নিরাপত্তা, স্বস্তি, শান্তি, সহযোগিতা দিন।
স্ত্রীকে ছোট করে আপনি কখনোই ‘বড়’ হতে পারবেন না, সংসার জীবনটাকে নিজ হাতে নষ্ট করবেন মাত্র। কাজেই একজন দায়িত্ববান স্বামী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হোন। স্ত্রীকে আর্থিক যোগান দেয়ার পাশাপাশি মাথায় রাখুন, কীভাবে তাকে মানসিকভাবে স্বস্তি দিবেন, সম্মান ও যত্নের চাদরে মুড়ে রাখবেন। স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হওয়ার মাধ্যমে আপনি নিজেও উত্তম ব্যক্তিত্বে পরিণত হচ্ছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أكمل المؤمنين إيمانا أحسنهم خُلقا، وخياركم خياركم لنسائهم
অর্থাৎ মুমিনদের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণ ঈমান তাদের, যারা তাদের আচরণে সুন্দর, আর তোমাদের মধ্যেই সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম।