বর্তমান সময়ে মেয়েদের মাঝে বিয়ের ব্যাপারে বেশ অনিহা দেখা যায়। বিয়ের বদলে তারা লেখাপড়া ও ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে। আর এই ব্যাপারে মেয়েদের উৎসাহ উদ্দীপনা যোগায় অনেক সময় তার পরিবার—বাবা-মারাই। তাদের অনেককে গর্ব করে বলতে শোনা যায়: আমার মেয়ে আগে নিজ পায়ে দাঁড়াবে। তারপর তার বিয়ের চিন্তা করব।
অনেকে মনে করে, ফিনানশিয়াল কন্ট্রিবিউশন না থাকলে স্বামীর সংসারে তার কোন দাম থাকবে না। পায়ের নিচে কোন মাটি থাকবে না। যেসব মেয়েরা চাকুরী করে না বা নিজেস্ব কোন আর্নি নেই, তারাই যেন কেবল মারাত্মক অত্যাচারের শিকার হয়! ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার কারা হয়? কেন হয়? এবং এর সমাধানের জন্য করণীয় কি তা এক ভিন্ন আলোচনা। তবে কিছু জরিপ থেকে আমাদের ধারণা উল্টো চিত্র দেখা যায়, যেখানে গৃহিনীদের তুলনায় কর্মজীবি নারীরাই অধিক সহিংসতার শিকার হয়েছে (Shafayatul Islam Shiblee et al.)।
আমি এমন এক বোনের গল্প বলতে চাই, যে তার বাবা-মায়ের বড় মেয়ে। তার কোন ভাই নেই। ছোটবেলা থেকেই তাকে বড় করা হয়েছে এমন মানসিকতা নিয়ে যেন সেই সংসারের বড় ছেলে। আর একসময় তাকেই সংসারের হাল ধরতে হবে। মেয়েটা দেশের অন্যতম ভার্সিটি থেকে পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে, কোমর বেঁধে নামে একটা সরকারি চাকুরির জন্য। এর মাঝে বিভিন্ন সময় তার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসে, কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অনড়—আগে ভালো একটা চাকুরিতে ঢুকবে, সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে আর তারপর বিয়ে। একটা সরকারি চাকুরির তার হলো বটে তবে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বয়স গড়িয়ে গেল অনেকটা। এখন আর তেমন কোন প্রস্তাব আসে না মেয়েটার। হ্যাঁ, এখন মেয়েটার স্ট্যাবল আর্নি আছে। কিন্তু এই আর্নিং কি তার জন্য যথেষ্ট!
আচ্ছা, কেবল ভরণপোষণ পাওয়ার জন্যই কি একটা মেয়ে বিয়ে করে! তাহলে কেন মানুষ বিয়েকে চাকুরির মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেয়! একটা চাকুরী কি একজন মেয়েকে দিতে পারে দাম্পত্য জীবনের সুকুন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে ভালোবাসার পবিত্র বন্ধন আল্লাহ তায়ালা দিয়ে দিয়েছেন, একটা চাকুরী কি পারে সেটা দিতে? আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে বিয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেনঃ
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে এটা রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; আর তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।সূরা রূম, আয়াত ২১
তিনি আরও বলেনঃ “নারীরা তোমাদের পোশাক, আর তোমরা তাদের পোশাক।” সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৭
বিয়ে হচ্ছে হালাল্ভাবে নারী ও পুরুষের জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম। বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সোয়াব লাভের উপায়। তাছাড়া দম্পতিদের একজন হতে পারে আরেকজনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু, সবচেয়ে প্রিয়জন—যাকে নিজের মনের সব খুলে বলা যায়; যেখানে থাকে না কোন ভঙ্গিতা। পারস্পরিক কল্যাণকামীতাই এই সম্পর্কের বুনিয়াদ। চাকুরী কি পারে মানুষের সেই জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে?
একজন মেয়ে পড়াশুনা বা চাকুরিতে ভালো করার জন্য, প্রমোশন পাওয়ার জন্য কত চেষ্টা সাধনাই না করে, যদি সংসারকে সুকুনের জায়গা বানানোর জন্য ও স্বামীর কাছে সবচেয়ে প্রিয়, অয়াস্থাভাজন-হওয়ার জন্য সে কিছু চেষ্টা সাধনা করত!
তাছাড়া একজন নারীর মাঝে মাতৃত্ব একটা ফিতরাত। একটা চাকুরী কি পারে আমাদের ফিতরাতের এই চাহিদা মেটাতে! একজন নারী মন থেকে চায় সন্তানের মা হতে। সন্তানদের সাথে সময় কাটাতে। আদর-যত্নে গড়ে তুলতে কাদামাটির মতো নরম তুলতুলে তার ছোট্ট শিশুটিকে। কিন্তু একটা মানব সন্তান প্রতিপালন করা ততটা সহজ নয়, তার দরকার সার্বক্ষনিক আদর-যত্ন-ভালোবাসা। কিন্তু একজন চাকুরীজীবী মা খুব স্বল্প সময়ই পায় তার সন্তানের জন্য। এই অবস্থায় তাকে সবচেয়ে বেশি ডিলেমাতে পড়তে হয়, সেকুলার কিংবা ইসলামী—সব ঘরানার নারীই যাদের মনে মাতৃত্বের ফিতরাত নষ্ট হয়নি—চায় সন্তানের জন্য চাকুরী ছেড়ে দিতে। কিন্তু অধিকাংশের ক্ষেত্রেই সেই চাওয়া পূরন হয় না। চাকুরির জন্য সন্তানের অধিকার হনন করা হয় নির্মমভাবে।
তাই কামাই থাকলে জামাই লাগে না---এই চিন্তা একেবারেই অবান্তর ও অবাস্তবসম্মত। এটা নারীকে পুঁজির বাজারে যথেচ্ছা ব্যবহার করার জন্য নির্মিত এক বয়ান। বোনেরা, আপনাদের মন-মগজে যদি এমন কিছু ঢুকে গিয়ে থাকে তবে তা যতদ্রুত সম্ভব সরিয়ে ফেলুন। যতদ্রুত জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে বুঝবেন, আপনার জন্য ততই কল্যাণকর।