৩১শে ডিসেম্বর রাত। ঘড়ির কাঁটা যখন ১২টা ছুঁইছুঁই, চারদিকে তখন এক কৃত্রিম উন্মাদনা শুরু হয়। আতশবাজির ঝলকানি আর কান ফাটা আওয়াজে প্রকম্পিত হতে থাকে আকাশ-বাতাস।
আধুনিক বিশ্বের কাছে এটি ‘নিউ ইয়ার ইভ’ করার উৎসব। কিন্তু এই আলোর ঝলকানির আড়ালে যে অন্ধকার লুকিয়ে আছে, তা যেমন ভয়াবহ, তেমনি লজ্জাজনক। একজন মুসলিমের কাছে এই রাতটি উৎসবের নয়, বরং জীবনের পরম পুঁজি থেকে একটি বিশাল অংশ চিরতরে হারিয়ে ফেলার শোকাতুর মুহূর্ত।
এই রাতটি আমাদের সামনে দুটি স্পষ্ট ও বিপরীতমুখী মানসিকতাকে তুলে ধরে। এটি ‘বিশ্বাসের সাথে অবিশ্বাসের’ এবং ‘আধ্যাত্মিকতার সাথে ভোগবাদের’ সংঘাত।
যারা আখিরাত, মৃত্যু পরবর্তী জবাবদিহিতা বা জীবনের চূড়ান্ত হিসাব নিয়ে উদাসীন, তারা মনে করে “আমরা একটা নতুন বছর পেলাম!” এই পাওয়ার ধারণাটি সম্পূর্ণ জাগতিক। তাদের কাছে জীবন মানে শুধুমাত্র কিছু মুহূর্তের সমষ্টি, যা কেবল ইন্দ্রিয়সুখ আর ভোগের জন্য। তাই তারা এই তথাকথিত ‘পাওয়া’কে উদযাপন করে মদ্যপান, উদ্দাম নাচ-গান আর সীমাহীন নোংরামির মাধ্যমে। তাদের কাছে আনন্দ মানেই হলো নফসের দাসত্ব করা।
কিন্তু একজন মুসলিম জানে “আমার হায়াত থেকে একটি বছর চিরতরে হারিয়ে গেলো।” এটি পাওয়ার আনন্দ নয়, বরং ফুরিয়ে যাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। প্রতিটি সেকেন্ড তাকে তার সুনিশ্চিত গন্তব্য কবরের দিকে টেনে নিচ্ছে। মহাকালের গর্ভে যে ৩৬৫টি দিন হারিয়ে গেলো, তার প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব তাকে দিতে হবে। ইয়াওমুল ক্বিয়ামাহতে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কেউ এক কদমও নড়তে পারবে না। যার মধ্যে একটি হলো, ‘সে তার জীবনকাল বা হায়াত কোন পথে ব্যয় করেছে?’ (তিরমিজি)। যেখানে ফেলে আসা বছরের ব্যর্থতার জন্য তওবা আর আগামীর জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত ছিল, সেখানে উৎসবের নামে উন্মাদনা করা কোনো বিশ্বাসীর কাজ হতে পারে না।
সময় হলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সুরা আসরে মহান আল্লাহ সময়ের কসম দিয়ে বলেছেন, “নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।” ৩১শে ডিসেম্বর রাত ১২টা মানে হলো আমাদের আয়ুষ্কাল থেকে একটি বছর বিয়োগ হওয়া। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সতর্ক করে বলেন, “মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে” (সুরা আল-আম্বিয়া: ১)।
হযরত হাসান বসরী (রহি.) বলতেন, “হে আদম সন্তান! তুমি তো কিছু দিনের সমষ্টি মাত্র। যখন একটি দিন অতিবাহিত হয়, তখন তোমার জীবনের একটি অংশই বিলীন হয়ে যায়।” আমরা যখন নতুন বছরকে ‘স্বাগতম’ জানাই, তখন আসলে আমরা মৃত্যুর এক বছর কাছাকাছি চলে যাই। এই অমোঘ সত্যকে ভুলে গিয়ে যারা পাপে মত্ত হয়, তারা মূলত নিজেদের ধ্বংসকেই ত্বরান্বিত করে। মৃত্যু যেখানে আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে এগিয়ে আসছে, সেখানে একজন বিবেকবান মানুষ কীভাবে গান-বাজনা আর অশ্লীলতায় মত্ত থাকতে পারে?
তথাকথিত নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনের আড়ালে নৈতিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মাদক আর উন্মাদনা যখন মানুষের বিবেককে গ্রাস করে, তখন তারা পশুর চেয়েও অধম হয়ে যায়। এই একরাতেই কী পরিমাণ অপকর্ম ঘটে তার একটা ফিরিস্তি দেখা যাক।
ভিড়ের সুযোগ নিয়ে এবং মদ্যপ অবস্থায় নারীদের ওপর চড়াও হওয়া এই রাতের এক নিয়মিত কলঙ্ক। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মিলেনিয়াম থার্টি-ফার্স্ট নাইটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ‘বাঁধন’ নামের এক তরুণীর শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনা সেই সময় টক অব দ্যা কান্ট্রি ছিলো। ২০১৫ সালেও টিএসসি এলাকায় একই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিলো।
২০১৬ সালে জার্মানির কোলন শহরে থার্টিফার্স্ট নাইটের ওপেন-এয়ার পার্টিতে প্রায় ১,২০০ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। ভারতের বেঙ্গালুরুতে ২০১৭ সালের একই রাতে ঘটেছিল গণ-শ্লীলতাহানি। তথাকথিত আধুনিকতার এই উৎসবের মোড়কে একদল হায়েনা নারীর সম্ভ্রম নিয়ে হোলি খেলায় মেতে ওঠে।
এই এক রাতেই যে পরিমাণ মাদক ও অ্যালকোহল সেবন করা হয়, তা বছরের অন্য যেকোনো সময়কে হার মানায়। ডিজে পার্টি আর ‘রেভ পার্টি’র নামে তরুণ প্রজন্মকে ঠেলে দেওয়া হয় অন্ধকার পথে।
চলতি বছরের (২০২৫) ঢাকায় থার্টিফার্স্ট নাইটের আতশবাজি ও পটকা বিস্ফোরণে ৫ জন দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো। এর মধ্যে ৮ বছরের শিশু ফারহানের শরীরের ১৫% পুড়ে গিয়েছিলো। ৩ বছরের তাসিন আর ১২ বছরের সিফানের মতো শিশুরা হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছিলো বড়দের এই বিকৃত আনন্দের বলি হয়ে। কামরাঙ্গীরচরে ফানুস উড়াতে গিয়ে সিয়াম নামের এক কিশোরের শরীরের ৮৮% পুড়ে যায়, যা তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলো।
ফানুসের কারণে এক রাতেই ঢাকার মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুরসহ ১০টি স্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিলো। মাতুয়াইল ও ধোলাইখালে আবাসিক বিল্ডিংয়ে ফানুস পড়ে নিঃস্ব হয়েছে অনেক পরিবার। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, আতশবাজি ও ফানুস থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট হয়।
মানুষের ক্ষণিকের আনন্দ নির্বাক প্রকৃতির জন্যও কাল হয়ে দাঁড়ায়। আতশবাজির বিকট শব্দ (১৪০-১৫০ ডেসিবল) পাখিদের জন্য যমদূত। ২০২১ সালে ইতালির রোমে শত শত পাখির মৃতদেহ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। উচ্চশব্দে পাখিরা হার্ট অ্যাটাক করে অথবা দিকভ্রান্ত হয়ে দালানের সাথে ধাক্কা খেয়ে প্রাণ হারায়।
২০২৪ সালে মেট্রোরেলের বৈদ্যুতিক লাইনে ৪০টি ফানুস আটকে গিয়েছিলো। এটি শুধু যাতায়াত বিঘ্নিত করেনি, বরং কয়েকশ কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি করেছিলো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, মানুষের সহনীয় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবল। অথচ আতশবাজির শব্দ ১৪০-১৫০ ডেসিবল পর্যন্ত পৌঁছায়। ২০২৪ সালের এক রাতেই যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে নাগরিকরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ৯৭১টি কল করেন। এর মানে হলো, আমরা আনন্দের নামে হাজার হাজার অসুস্থ রোগী, বৃদ্ধ এবং শিশুদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছি।
ইসলাম প্রতিটি কাজে ভারসাম্য ও শালীনতার শিক্ষা দেয়।পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই” (সুরা ইসরা: ২৭)। এক রাতে আতশবাজি আর ডেকোরেশনের নামে যে টাকা উড়ানো হয়, তা দিয়ে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষের অন্নসংস্থান সম্ভব ছিলো।
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে”(সুনানে আবু দাউদ)। এই নিউ ইয়ার উদযাপন সম্পূর্ণ পৌত্তলিক ও পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে আমদানিকৃ্ত, যা একজন মুসলিমের ঈমানি চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক।
যে রাত অন্যের ঘর পোড়ায়, যে রাত বনের পাখিদের মেরে ফেলে, যে রাত নিষ্পাপ শিশুর শরীর ঝলসে দেয়, যে রাত আমাদের কবরের নিকটবর্তী হওয়ার কথা ভুলিয়ে দিয়ে গুনাহের সাগরে ডুবিয়ে দেয়। সেই রাত কখনো ‘হ্যাপি’ হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (বুখারি)। অথচ থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে আমরা প্রতিবেশীর ঘুম হারাম করি, আতশবাজি ফুটিয়ে অসুস্থ মানুষকে কষ্ট দেই, ফানুস উড়িয়ে অন্যের সম্পদ পোড়াই। এগুলো শুধু গুনাহই না, বরং হাক্কুল ইবাদ নষ্ট করার শামিল।
আমরা অবিশ্বাসী বা আত্মভোলাদের অন্ধ অনুকরণ না করি। জীবনের সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে। ফানুসের বিষাক্ত ধোঁয়ায় আকাশ কালো করে কতটুকুই বা ইন্দ্রিয়সুখ মেলে! আজকের এই উৎসবের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব অপেক্ষা করছে সেই দিনের জন্য, যেদিন কোনো আতশবাজির আলো আমাদের অন্ধকার কবরকে আলোকিত করবে না।