“ইউরোপীয় নারী” শব্দটা শুনলেই আমাদের সামনে স্বাধীন, শিক্ষিত, ক্যারিয়ার ড্রিভেন, সোশ্যালি লিবারেল, খোলামেলা পোশাক পরিহিতা একজন নারীর ইমেজ ক্রিয়েট হয়। পশ্চিমা মিডিয়া এমন নারীমূর্তি দেখিয়ে আমাদের উইমেন এম্পাওয়ারমেন্টের গল্প শোনায়, আমাদের নারী অধিকারের স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দেয়। তাদের ভাষ্য মতে, ইউরোপীয় নারীই ‘নারী অধিকার’-এর মূর্ত প্রতীক।
কিন্তু আমরা যদি উনবিংশ শতাব্দীর পূর্বের ইউরোপের দিকে তাকাই, চিত্রটা আজকের ইউরোপীয়দের আওড়ানো বুলির মতো এতো ঝকঝকে নয়।
সপ্তদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে, ইউরোপে বিবাহ বিচ্ছেদ বেশ ব্যয়বহুল ছিলো। সেই সময় নিম্নশ্রেণীর কিছু ব্রিটিশ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ বিবাহবিচ্ছেদের দিকে না এগিয়ে, তাদের স্ত্রীদের বিক্রি করে দিতো। বিক্রির জন্য নারীদের বেঁধে বাজারে এনে রীতিমতো পশু কেনাকাটার মতো নিলামে তোলা হতো। সেসব নারীদের কিনে নিতো, অপেক্ষাকৃত ধনী শ্রেণির পুরুষরা। এই বেচাকেনার প্রক্রিয়াটি টেকনিক্যালি লিগ্যাল ছিলো না। তবে এর গ্রহনযোগ্যতা এতো বেশি ছিলো যে, যেখানে আইনও কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছিলো।
সেই সময়টায়, ব্রিটিশ আইনে বহুল প্রচলিত প্রথা ছিলো “কভারচার আইন”। এর মানে হলো, একজন বিবাহিত নারীর নিজস্ব লিগ্যাল কোনো আইডেন্টিটি থাকবে না। অর্থ্যাৎ, স্বামী ও স্ত্রী মিলে আইনের চোখে ” One Person” হিসেবে গণ্য হবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী “Husband and wife are one person, and that person is the husband”. এই অদ্ভুত আইনের পরিপ্রেক্ষিতে, একজন স্ত্রীর কোনো প্রকার চুক্তি, মামলা ইত্যাদী আইনি কোনো কার্যক্রম করার ক্ষমতাই থাকতো না। স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তিতেও তার হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার ছিলো না। বিয়ের পর তার সকল সম্পত্তি স্বামীর হয়ে যেতো। সেই সম্পত্তি যদি স্বামী কোনো অবৈধ খাতে ব্যয় করতো, তারও বাঁধা দেয়ার কোনো আইনি ক্ষমতা নারীর ছিলো না। যেহেতু স্বামী স্ত্রী লিগ্যালি ওয়ান পারসন, সেহেতু মানুষ নিজের বিরুদ্ধে কিভাবে মামলা করতে পারে!
কিন্তু আমরা যদি সেই সময়কালের মুসলিম নারীর দিকে তাকাই, চিত্রটা একদম বিপরীত।
মুসলিম নারী তখন ছিল শিক্ষিত, সম্মানিত, স্বাধীন ও সমাজে সক্রিয়। তাঁরা নিজেদের সম্পত্তি, মাহর, উপার্জন সব নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতো। স্বামীর এগুলোতে অবৈধ হস্তক্ষেপ ছিলো না। নারীদের পারিবারিক জীবনে মর্যাদা ছিল অটুট। ভরনপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ছিলো, এসব দায়িত্ব পুরোপুরি পালন না করলে তার জন্য তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ক্ষমতা রাখতো স্ত্রী। পর্দার আড়ালে নারীর মর্যাদা, অধিকার ছিলো নিশ্চিত। সেই সময়ের মুসলিম নারীর জীবনাচার ছিল পশ্চিমা নারীর জন্য কাঙ্ক্ষিত। ইসলামের বিধিমালাকে অনুসরণ করে, নারীরা ছিলেন সম্মানিতা। মুসলিম নারীর অধিকার নিশ্চিতে তাদের কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন পড়েনি। ইসলামের নীতিমালাই তাকে দিয়েছে মর্যাদা, অধিকার, স্বাধীনতা এবং সম্মান।
ইউরোপীয় নারীকে অধিকার পেতে যুগের পর যুগ সংগ্রাম করতে হয়েছে, ইসলামের শাশ্বত বিধান মুসলিম নারীদের সহজেই তা পাইয়ে দিয়েছে। শুধু সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাই নয়, শিক্ষার অধিকার,আইনগত মর্যাদা সবই তার জন্য ছিল নিশ্চিত।
ফেমিনিজম বিংশ শতাব্দীতে এসে নারীর যেসকল সমস্যা আর সমাধান নিয়ে আওয়াজ তুলছে, মুসলিম নারীর ইতিহাসে এসব শোষণের সমাজ স্বীকৃত কোনো চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মুসলিম নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলামের বাহিরের কোনো বিতর্কিত, ভঙ্গুর মতবাদের প্রয়োজন নেই। কারন ইসলাম নারীর মর্যাদা, অধিকার রক্ষায় হাজার বছর আগেই সুবিন্যস্ত নীতিমালা প্রনয়ন করে দিয়েছে।
যেখানে ইউরোপীয় নারীকে নিজের সম্পত্তির উপর অধিকার পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৮৮২ সালের ‘Married Women’s Property Act’ পর্যন্ত, সেখানে মুসলিম নারী ‘হিজরতের প্রথম দিন থেকেই’ তার মাহর, সম্পদ, উত্তরাধিকার সব নিজের মালিকানায় রাখার অধিকার পেয়েছে। যখন ইউরোপে “Rule of Thumb” নামে স্বামীদের স্ত্রীকে মারার আইনগত ছাড় ছিল, তখন ইসলাম ঘোষণা করেছে “তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর প্রতি উত্তম।” এটা মুসলিমদের নৈতিক স্ট্যান্ডার্ড।
পশ্চিমা নারীর ইতিহাসের সাথে মুসলিম নারীর ইতিহাসকে গুলিয়ে ফেলা চরম বোকামি। মুসলিম নারীর সম্মান কোনো সামাজিক চুক্তির ফল নয়, কোনো মানবিক আন্দোলনের অর্জন নয়, এটা তার রব্বের পক্ষ থেকে দেয়া এক মর্যাদা।
ইসলাম নারীর জন্য সেইসময় অধিকার নির্ধারণ করেছে, যখন দুনিয়ার সভ্যতাগুলো নারীর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতো। বিয়ের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার, মাহর, নিরাপত্তা এসব ইসলাম দিয়েছে সেই সময়েই যখন পৃথিবীর অন্য সমাজগুলো নারীর মানবিক মূল্যই বুঝতো না।
মুসলিম নারীর জন্য পশ্চিমা কোনো আন্দোলন, কোনো ইজম, কোনো স্লোগানের প্রয়োজন নেই। কারণ তার স্বাধীনতার সংজ্ঞা দেয় তার রব্ব। তার মর্যাদা রক্ষা করে তার দ্বীন। তার সম্মান নিশ্চিত করে আল্লাহ তা’য়লার বিধান। মুসলিম নারী তার গৌরব কোনো আধুনিক চিন্তাধারায় খুঁজে পায় না। তার শক্তি নিহিত তার ঈমান, তার হায়া, তার চরিত্র, তার তাক্বওয়ায়।
মুসলিম নারীর অধিকার নিশ্চিতে, পশ্চিমা ফেমিনিজমের ভুলভাল প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজন হয় না। পশ্চিমা ইতিহাসে নারী অধিকার নিশ্চিতের জন্য লড়াই করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। মুসলিম নারী পরিপূর্ণ, সুবিন্যস্তভাবে, সম্মানের সাথে সেই অধিকার পেয়েছে ইসলামের প্রারম্ভিক কাল থেকেই।