নারীবাদ যেমন ভয়ংকর তেমনি নারীর প্রতি জুলুমও ভয়ংকর। কিছু ক্ষেত্রে কিছু পুরুষের নারীর প্রতি বিরূপ মনোভাবের কারণে তার ঘরের নারীদের মধ্যে নারীবাদ বা নারীবাদের কিছু শাখা ঢুকে পড়ে।
আমি আমার ক্লাসমেটদের দেখেছি, এদের সবাই নারীবাদী মানসিকতার নয়। তবে এদের মধ্যে চাকরি করার মানসিকতা লক্ষণীয়। ইসলামে অনর্থক, অপ্রয়োজনে নারীর চাকরি করার অনুমতি দেয়নি। তবে,কেউ চাকরি করতে চাইলেই যে সে নারীবাদী হয়ে যায়, বিষয়টা মোটেও এমন নয়। বরং আমি আমার সহপাঠীদের যাদের দেখেছি চাকরি করতে চায়, তারা চাকরি করাটাকে গ্রহণ করেছে সম্মান পাওয়ার কার্ড হিসেবে।
বিশ্বাস করুন, এদের অনেকের এই মানসিকতা তাদের পরিবারের চিত্র দেখে মাথায় ঘুরে কিংবা তাদের মায়েরা এই মানসিকতা গড়ে দেয়। কারণ তারা দেখে এসেছে শুধু মাত্র চাকরি না করার কারণে তাদের মায়েরা সন্তান, সংসার দেখাশোনা করার মত মহৎ কাজ করেও (শিক্ষিত, অশিক্ষিত যাই হোক না কেন) কিভাবে প্রতিনিয়ত খোঁটা খায়, অপমানিত হয়। দিনের পর দিন নিজ সংসারেই ছোট হয়ে থাকতে হয়। (বাকিরা যারা ইন জেনারেল চাকরি করতে চায় তাদের কথা এখানে প্রাসঙ্গিক না।)
অথচ তারা যদি প্রোপার সম্মান, যত্ন পেতে দেখতো তাদের মায়েদের, তাহলে বোঝালে হয়তো তারাও চাকরির মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতো। তারা মনে করে চাকরি করলে স্বামীরা গুরুত্ব, সম্মান দিবে, খোঁটা দিবে না। বিশ্বাস করুন, এর সত্যতা অনেক পরিবারেই দেখা যায়, নিজ চোখে দেখা।
কিন্তু সত্য কথা তো এই যে, নারীর সংসার জীবনে সম্মান পাওয়া নির্ভর করে তার স্বামীর মেন্টালিটির উপর। স্বামী যদি খারাপ মেন্টালিটির হয় তাহলে সে তার স্ত্রীকে শুধু চাকরি না, আরও এমন অনেক বিষয় নিয়ে খোঁটা দিবে যা সংসারের জন্য জরুরি নয়। যদি ভালো মেন্টালিটির ভালো মানুষ হয় তাহলে সে কখনোই তার স্ত্রীকে এমন বিষয়ে খোটা দিবে না,অপমান করবে না বা খোঁটা দেওয়ার চিন্তা করবে না যা সংসারের জন্য জরুরি নয়। শাসন করাই যায়, তবে কারো অন্তর পুড়িয়ে নয়।
দিনদিন নারীবাদের ভূমিকা, এর ক্ষতিকর দিকের আদ্যপান্ত নিয়ে কথা হলেও কথা হয় না নারীর প্রতি জুলুম ও অসদাচরণ করা পুরুষদের নিয়ে।
দ্বীনের বুঝ সম্পন্ন ভাইদের মধ্যে অনেকেরই এই প্রবণতা লক্ষণীয়। আপনি স্বীকার করুন আর না করুন, এক শ্রেণির নারীদের নারীবাদী হওয়ার পিছনে সমাজের এক শ্রেণির পুরুষ দায়ী। সাথে পশ্চিমা প্রোপাগাণ্ডা, মতবাদ তো আছেই ব্রেইন ওয়াশের জন্য।
প্রথমেই বলছি আমরা যারা দ্বীন মেনে চলার কম বেশি চেষ্টা করি, আমরা পরিবারের পুরুষ কর্তার কর্তৃত্ব মানতে সবসময়ই রাজি থাকি। বিয়ের আগে বাবা, বড় ভাইয়ের, বিয়ের পর স্বামীর। আমরা এই মানসিকতা নিয়েই আমাদের চিন্তা-চেতনা,চারপাশের পরিবেশকে ডেভেলপ করি যে, আমি তার কর্তৃত্ব মেনেই চলবো।আমরা এই কর্তাদের টপকে যাওয়ার বা অনর্থক তাদের বিরুদ্ধাচরণ করার নই। কিংবা তাদের সাথে সমকক্ষ হওয়ার মতো প্রতিযোগিতা করার মনোভাবও পোষণ করি না।
কিন্তু তাই বলে আমরা মতামত দিতে পারবো না,আমাদের মতামতের মূল্য নেই বিষয় টা কখনোই এমন নয়। বরং স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা তো সুন্নাহ। স্বয়ং রাসুল সা: হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল আম্মাজান উম্মে সালামা রা: এর পরামর্শে করেছিলেন।
কিন্তু যারা নারী বিদ্বেষী মেন্টালিটি লালন করেন, দুঃখজনক ভাবে বলতে হয়,তারা স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করাকে, স্ত্রীর মতামত গ্রহণ করাকে নিজেকে ছোট করা হয় মনে করেন।মানে তাদের হ্যাঁ তে হ্যাঁ, না তে না বলতে হবে।যদি মতের বিপরীত হয়,তাহলেই স্ত্রী তাকে সম্মান করে না। ফলস্বরূপ তাদের নিকট স্ত্রীর মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে না। এই স্ত্রীদের উপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক সময় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। তারাও মেনে নেয় সংসারে মনোমালিন্য, অশান্তি হওয়ার আশংকায়। অথচ রাসুল সা: তা মনে করেননি যে, স্ত্রীর পরামর্শ শুনলে তিনি সা: ছোট হয়ে যাবেন।
আপনাকে মানতে হবে, আপনার স্ত্রী আপনার আপন কেউ, পর নয়।সব সময় তাকে বাহিরের মেয়ে মনে করলে আর যাই হোক সংসার জীবনে সুখী হওয়া যায় না। তাকে মানুষ মনে করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুটো ভিন্ন সত্তা, ভিন্ন পরিবার, ভিন্ন রক্ত থেকে আগত মানুষের মতামত,চিন্তাভাবনায় ভিন্নতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আপনি তার কথাটুকু শুনুন। তার পর আপনি ভালো মন্দ,সঠিক ভুল বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন। বিশ্বাস করুন, তার মতামত শুনছেন, গুরুত্ব দিচ্ছেন, এটাই অনেক বড় পাওয়া একজন নারীর নিকট তার স্বামীর কাছে। কিন্তু আপনি সবসময় সঠিক, আপনার মতামতের বাইরে যাবেন না (ভুল হলেও, বিপরীত ব্যক্তির কষ্ট বা অসস্তি থাকলেও) এমন মনোভাব লালন ও পালন করা থেকে বের হয়ে আসুন। আপনিও যে ভুল হতে পারেন এটা মাথায় রাখুন।অনেক সময় আলোচনার পর ভুল বের হয়ে আসে।
বলা হয়েছে নারীকে (হাওয়া আ:) তৈরি করা হয়েছে পাজরের বাঁকা হাড় হতে। অর্থাৎ তার মধ্যে সৃষ্টিগত ভাবে বক্রতা রয়েছে।সে অভিমান করবে, রাগ, জিদ করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে হ্যাঁ, তা অবশ্যই সঠিক সীমার মধ্যে থাকা উচিত। কিন্তু নারীর প্রতি জালেম এমন পুরুষও আমি দেখেছি যারা মনে করে, স্বামীরা তো একটু রাগ করে বা রাগ দেখিয়ে কথা বলবেই, খোঁটা দিবেই। কিন্তু স্ত্রীকে সবসময় তা সয়ে যেতে হবে। স্ত্রী রাগ,অভিমান করতে পারবে না। সে সবসময় মেনে নিবে। উল্টো রাগ, অভিমান করলে তারা চূড়ান্ত বিরক্ত, অযথা নখড়া মনে করেন। জাহান্নামে নারীরা অধিক প্রবেশ করবে বলে কথায় কথায় কিছু হলেই স্ত্রীর ভুল নিয়ে কথা শুনিয়ে দেওয়া কোন ধরনের নেক কাজের মধ্যে পড়ে, আপনিই বলুন!
অথচ রাসুল সা: স্ত্রীর অভিমানকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ভালোবেসে অভিমান ভেঙেছেন। স্ত্রীর রাগ,অ ভিমান করা যাবে না বলে নারী সত্তাকে নিঃশেষ করে দেননি। ইসলামে নারীকে অনেক সম্মান দেওয়া হয়েছে,যা পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মে দেওয়া হযনি।
শুধু পর্দায় রাখা, ভরণপোষণ দেওয়াই তাকে সম্মান করা নয়।তাকে যত্ন করা, তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, তার সাথে পরামর্শ করার মাধ্যমেও তাকে শ্রদ্ধা করা হয়।
বিয়ে করে সুন্নাহ মেনে এটা করবো, ওটা করবো অনেক চিন্তা করলেও অনেক পুরুষ এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসে না।কোথায় যেন দেখলাম, একজন লিখেছে- “স্ত্রী কখনোই পুরুষের সফলতার কারণ ছিল না। পুরুষ সফল হয় তার মায়ের কারণে।অসফল ধ্বংস হয় স্ত্রীর কারণে।“
এই ধরনের মানসিকতার পুরুষেরা ভেবেই রেখেছে সে আস্ত একটা কুমির আনছে ঘরে, যে কেবলই তার অশান্তির কারণ হবে। সে বাহিরের মেয়ে, স্ত্রী মানেই খারাপ। সত্যি আমি এমন মানুষ সচক্ষে দেখেছি।
স্ত্রী যদি এতটাই ফেলনা, গুরুত্বহীন হতো, তাহলে বিয়ে করাকে উৎসাহিত করা হতো না। হাদিসেও আসতো না যে, পৃথিবীতে যত নিয়ামত আছে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো নেককার স্ত্রী।
এই ধরনের মানসিকতা থেকে বের হয়ে যদি না আসা হয়,তাহলে নিজে তো অশান্তির আগুনে পুড়বেনই সাথে আশেপাশের মানুষদেরও শান্তিতে থাকতে দিবেন না। ইসলামকে প্রোপারলি মানা হলে সত্যি বলতে এরকম হয়না। এদের বেশির ভাগই অল্প জ্ঞানে লাফায় বেশি পাবলিক নয়তো নিজেদের ইগো থেকে বের হতে না চাওয়া পাবলিক।
দয়া করে নারীবাদ সম্পর্কে শুধু নারীরা নয়, ভাইয়েরাও পড়ুন।নারীবাদের না জেনেই যাকে তাকে নারীবাদী বলা বন্ধ করুন।কুরআন, হাদিসে স্ত্রীর করণীয় কি, উত্তম নেককার নারীর গুণবলি কি সেগুলো না দেখে নেককার পুরুষদের বৈশিষ্ট্য,গুণাবলি কি, স্ত্রীর সাথে রাসুল সা: এর ব্যবহার, করণীয়, সালাফে সালেহীনদেন সংসার জীবনে কেমন ছিলেন সেগুলো জানুন, শিখুন চর্চা করুন। স্ত্রীর প্রতি ইহসান মনোভাবাপন্ন হওয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ! সুতরাং ইহসান করুন, জুলুম নয়।
বোনেরাও স্বামীর বিষয় না দেখে নিজেদের দিকটা দেখুন, শিখুন জানুন, চর্চা করুন। মানে অন্যের চরকায় তেল না দিয়ে নিজের চরকায় দিন। তাহলে ইনশাআল্লাহ প্রত্যেকে প্রত্যেকের দিক থেকে সৎ সঠিক হবো। ভবিষ্যত সঙ্গী-সঙ্গীনীর জন্য চক্ষু শীতলকারী হবো ইনশাআল্লাহ।
(বি: দ্র: লিখার উদ্দেশ্য পুরুষদের মনোভাব নিয়ে। যেসব সংসারে স্ত্রীরা আসলেই খারাপ, ঝামেলা বাধায় আমি সেসব স্ত্রীদের পক্ষে নই। অযথা বিষয় এনে লিখার উদ্দেশ্য নষ্ট করবেন না। আমি সব সময় সঠিকের পক্ষে থাকার চেষ্টা জারি রাখবো ইনশাআল্লাহ, সে যে পক্ষই হোক না কেন।ওয়ামা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ।)