শরীফ ওসমান বিন হাদি (রহিমাহুল্লাহ), এক ক্ষণজন্মা স্ফুলিঙ্গ। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মধ্য দিয়ে একটি শরীরী মানুষের প্রস্থান ঘটলেও, একটি আদর্শিক বজ্রকণ্ঠের জন্ম হলো। ৩২ বছরের জীবনে তিনি যা দিয়ে গেছেন, তা শত বছরের গড়পড়তা জীবনের চেয়েও মহিমান্বিত। কিন্তু ওসমান হাদিই কেন শত্রুদের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন?

এই জমিনের যে গুটিকয়েক মানুষ এই এই ভূখণ্ডের শত্রুদের সুনির্দিষ্টভাবে এড্রেস করতে পেরেছিলো, তাদের সিপাহসালার হয়ে উঠেছিলেন ‘ওসমান হাদি’। হাদি ভাইয়ের স্পষ্ট একটা ভিশন ছিলো। শত্রুরা সেটা বুঝতে পেরেছিলো। তারা আঁচ করতে পেরেছিলো, হয়তো তিনি টিকে থাকলে তাদের আধিপত্যবাদের মসনদ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। হাদি ভাইয়ের সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক ছিল না, এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আত্মমর্যাদার লড়াই।

ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং বিজাতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিটি বক্তব্য ছিল শাণিত তরবারির মতো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে তিনি একটি বিপ্লবে পরিনত করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এ ভূখন্ড কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ হবে না। তিনি ইনসাফের ডাক দিয়েছিলেন। আর এ ডাকই কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলো।

তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, যারা রক্তের ওপর দিয়ে রাজত্ব করতে চায়, তাদের কোনো পুনর্বাসন হবে না। এই আপসহীন মানসিকতাই তাঁকে শত্রুদের প্রধান টার্গেটে পরিণত করেছিলো। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর তাঁর চোয়ালে গুলি করা মানে ছিল, বাংলার তারুণ্যের প্রতিবাদী আওয়াজকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু ‘হাদি’-রা এতো স্পিরিট কোথায় পায়? তাঁদের বজ্রকন্ঠের জ্বালানি কি?

তাঁরা বজ্রকণ্ঠে ময়দানে সিংহ হতে পেরেছিলেন কারণ তাঁদের অন্দরমহল ছিল ইস্পাতকঠিন। একজন নারীর জন্য এর চেয়ে কঠিন পরীক্ষা আর কী হতে পারে, যখন তিনি জানেন তাঁর স্বামী, সন্তান কিংবা ভাইয়ের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে ছায়ার মতো লেগে আছে মৃত্যু? তবুও তাঁরা পার্থিব মোহ কিংবা ব্যক্তিগত আবেগকে হকের পথে বাধা হতে দেন না। বরং তাঁরাই এক অদৃশ্য বর্ম হয়ে তাঁদের পুরুষদের ঘিরে রাখেন, যাতে বাতিলের সামনে তাঁদের শিরদাঁড়া কখনো নুয়ে না পড়ে। বিপ্লবীদের ঘরের নারীরা থাকেন তাঁদের লড়াইয়ের অদৃশ্য চালিকাশক্তি। অন্দরমহলের এই ইস্পাতদৃঢ় সমর্থন আর অবিচল প্রেরণাই মূলত রাজপথের লড়াইকে এক একটি ইন্তিফাদায় রূপ দেয়।

হাদি ভাইয়ের শাহাদাতের এই চরম শোকের মুহূর্তে তাঁর স্ত্রীর যে রূপ আমরা দেখেছি, তা আমাদের চেনা সব সমীকরণ ওলটপালট করে দেয়। বর্তমান এই প্রচারসর্বস্ব যুগে, যেখানে সামান্য বিপদে মানুষ ক্যামেরার সামনে এসে সহানুভূতির বাণিজ্য করে, সেখানে এই আজাদীর সহধর্মিণী নিজেকে ঢেকে রেখেছেন এক অনন্য আভিজাত্যে। যখন তিনি তাঁর স্বামীর নিথর দেহটি শেষবারের মতো দেখতে এলেন, তখন চারিদিকের মিডিয়া ও ক্যামেরাম্যানদের কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হলো ক্যামেরা বন্ধ রাখার জন্য। এমনকি তিনি যখন গাড়ি থেকে নামছিলেন এবং গাড়িতে উঠছিলেন, তখন যেন কোনোভাবে কোনো লেন্সে তাঁর অবয়ব ধরা না পড়ে, সেজন্য দুটি রানিং পর্দা দিয়ে তাঁকে আড়াল করে রাখা হয়েছিলো।

সদ্য স্বামী হারানো নারীর এই পাহাড়সম দৃঢ়তা প্রমাণ করে যে, পরিস্থিতি যত ভয়ংকরই হোক না কেন, ইসলামের বিধান এবং নিজের ‘গাইরত’ বিসর্জন দেওয়া কোনো মুমিনার সিফাত নয়। স্বামী পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর হুকুম তো একই আছে! প্রিয়জনের মৃত্যুতে অস্থির হয়ে পর্দা নষ্ট না করে তিনি যে গাম্ভীর্য দেখিয়েছেন, তা বর্তমান জামানার তথাকথিত দ্বীনদার এবং প্রচারপ্রিয় মানুষদের জন্য এক জীবন্ত চপেটাঘাত। মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজারো নসিহত করার চেয়েও কঠিন হলো জীবনের এমন মুহূর্তে পর্দা ও আদর্শে অবিচল থাকা, যা হাদি ভাইয়ের স্ত্রী বাস্তবে করে দেখিয়েছেন।

আমরা চাই যুগে যুগে ওসমান হাদিরা আসুক, এই জমিনের ঘরে ঘরে এমন বীরেরা জন্ম নিক। যারা জালিমের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্যের ঝাণ্ডা তুলে ধরবে। কিন্তু আমরা কি হাদিদের মা কিংবা স্ত্রীদের সেই নিদারুণ ত্যাগ আর বিসর্জনকে নিজেদের জীবনে হাসিমুখে স্বেচ্ছায় বেছে নিতে প্রস্তুত?

আমরা কি আমাদের সন্তানদের কেবল নিরাপদ ক্যারিয়ারের স্বপ্নে বিভোর না করে, সত্যের জন্য বুক পেতে দেওয়ার মতো অকুতোভয় করে গড়ে তুলতে রাজি আছি? আমরা কি প্রস্তুত আমাদের প্রিয়তম মানুষদের হকের পথে বিলিয়ে দিয়ে একাকী পথ চলার সেই কঠোর ‘সবরে জামিল’ নিজেদের হৃদয়ে ধারণ করতে? যদি আমরা সেই ত্যাগের কঠিন পথকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করতে না পারি, তবে আমাদের এই বীরের বন্দনা শুধুমাত্র সাময়িক আবেগ হিসেবে থেকে যাবে।