সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মত আমাদের মুসলিম সমাজের অনেকেই এটা বিশ্বাস করে যে, বিয়ে পড়ানোর আগে বর-কনের গায়ে ‘হলুদ’ না ছোঁয়ালে, অমংগল হয়।

‘গায়ে হলুদ’টা ইসলামী কোন সংস্কৃতি না। কিন্তু এটা কোনো গুনাহের কাজও নয়। তবে, এটা যদি ইবাদত বা ইসলামের নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে ভুল হবে। এটা ইবাদতের বিষয় নয়। ইসলামের আলোকে এটাকে না দেখাই উত্তম হবে।

‘গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান’ শরী‘আত সম্মত নয়। এগুলো কুসংস্কার ও অমুসলিমদের অনুকরণ। যা নিষিদ্ধ (আবূদাঊদ হা/৪০৩১; মিশকাত হা/৪৩৪৭)।

একদা সাহাবীর গায়ে হলুদ রঙ দেখে নবী (সা:) বুঝেছিলেন, তিনি নব-বিবাহিত। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩২১০নং) সেটা হলুদের রঙ নয়। বরং স্ত্রীর দেহের (মহিলাদের ব্যবহার্য্য একপ্রকার সুগন্ধি) ‘খালুক’এর হলুদ রঙ; যা তাঁর কাপড়ে লেগে গিয়েছিল।(ফাতহুল বারী ৯/১৪৪)

সুতরাং এটাকে পাত্র-পাত্রীর জন্য হলুদ মাখার বৈধতার দলীল মানা যায় না।

গায়ে হলুদ হিন্দুদের বৈবাহিক রীতি। বৈদিক যুগ থেকে ভারতীয় হিন্দুসমাজে গাত্রহরিদ্রা বা অধিবাস বিবাহ অনুষ্ঠানের অবশ্য পালনীয় শাস্ত্রাচার ও লোকাচার হিসাবে পালিত হয়ে এসেছে। পুরাণ মতে বিয়ের আগে গায়ে হলুদ সর্বপ্রথম মাখানো হয়েছিল পার্বতীকে শিবরাত্রির আগে, সেই থেকেই এই অনুষ্ঠানের জন্ম। হিন্দু সমাজে বর-কনের দাম্পত্য জীবনকে যেকোন ধরনের অকল্যাণ বা অপশক্তির অনিষ্ট থেকে মুক্ত রাখার কামনা থেকে যেসব লোকাচার পালন করা হয়, গায়ে হলুদ এসবেরই একটি। ভারতবর্ষে মুসলমানরা আসার পর তারাও এসব রীতিপদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকে (বাংলাপিডিয়া; দৈনিক আনন্দবাজার, কলকাতা)।

আরও একটি বিষয় বলা যেতে পারে, ভারতের সমাজে হিন্দু ধর্ম সংষ্কৃতি হিসেবে অনেক বেশি পরিব্যাপ্ত। এমনকি অনেক হিন্দু ধর্ম থেকে বিপুল পরিমাণ মানুষ ইসলাম বরণ করে নেয়াতে তাদের সংষ্কৃতি ও আচারের অনেক কিছুই উপমহাদেশের মুসলমানদের জীবনাচারে থেকে গিয়েছে। তবে এগুলো কোন ভাবেই ইসলামের আচার বলা যাবে না। ইতিহাসের আলোকে দেখলে মনে হয়, এখনকার গায়ে হলুদ সংষ্কৃতিটা অনেকটা হিন্দু ধর্ম বা আচার দ্বারা প্রভাবিত।

আমাদের দেশের ‘হলুদের অনুষ্ঠান’এ বর-কনে’র জন্য তাদের সামনে হলুদ বাটা রাখা হয়, কিন্তু তা বর-কনের মুখে বা গালে লাগানো হয় না। মেকাপ নষ্ট হয়ে যাবে, ছবি ভাল আসবে না তো তাহলে, বর-কনের হাতে একটু হলুদ ছোঁয়ানো হয় আর কি!

অনেক বর-কনের পিতা-মাতা হজ্জ করে এসেছেন, অনেক বর-কনে নিজেরাও বিয়ের আগে হজ্জ পালন করে ফেলেন মাশা আল্লাহ৷ কিন্তু পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আবদারের কারণে পিতা-মাতা বা বর-কনে হলুদের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন।

কিন্তু, তাই বলে হলুদের অনুষ্ঠান কি বৈধ হয়ে গেছে?

বেশির ভাগ পরিবারেই এই হলুদের আয়োজন করা হয় মৌজ-মাস্তি-নাচানাচি করার জন্য। বর-কনেকে হলুদের আসনে বসানোর সময় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজে আর সাথে তাদের আত্মীয় বা কাজিনরা নাচতে নাচতে বর-কনেকে নিয়ে তাদের আসনে বসাতে নিয়ে যান।

আজকাল তো বর-কনে নিজেরাও মিউজিকের তালে তালে নাচতে নাচতে স্টেজ এ গিয়ে বসে। নাউজুবিল্লাহ!

অথচ হাদিসে এসেছে:

নাফে‘ (রাঃ) বলেন, একদা ইবনু ওমর বাজনা শুনে দু’কানে আঙ্গুল দিলেন এবং রাস্তা থেকে দূরে সরে গেলেন। অতঃপর আমাকে বললেন, নাফে তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ কি? আমি বললাম না। তখন তিনি আঙ্গুল কান থেকে সরালেন। অতঃপর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সাথে ছিলাম। তিনি অনুরূপ করেছিলেন (আবুদাঊদ হা/৪৯২৪; মিশকাত হা/৪৮১১, সনদ হাসান)।

স্টেজে কনের দেবর কনের পাশে বসে কনের হাতে হলুদ ছোঁয়াচ্ছেন, বরের শ্যালিকা বরের হাত ধরে স্টেজে বসাতে নিয়ে যাচ্ছেন। এরা তো সবাই সবার নন-মাহরাম। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে সব অবৈধ জিনিসকে, অশ্লীলতাকে আমরা বৈধতা দিয়ে যাচ্ছি!

খাওয়ার পর্ব শেষ করে ডিজে’র সাথে ছেলে-মেয়ে মিলেমিশে নাচানাচি করে। আবার অনেকে হলুদ বা নানান ধরনের রঙ একজন আরেকজনের মুখে মাখিয়ে দেয়। কোনো মেয়ে হয়তো নিজের স্বামীকে রঙ না মাখিয়ে অন্য পরপুরুষের মুখে রঙ মেখে দিচ্ছে! কোনো ছেলে হয়তো অন্য মেয়েকে (পর স্ত্রী) ধরে ছবি তুলছে। এসব কি বৈধ ইসলামে?

দ্বীন পালনরত কিছু মানুষও পিছিয়ে নেই। তারা বাসায় নিজেরা দ্বীন পালন করছেন, সন্তানদের দ্বীনের শিক্ষা দিচ্ছেন। তারাও এসব হলুদের অনুষ্ঠানে গিয়ে ডিজে পার্টি, নাচানাচি দেখছেন। নিজেদের সন্তানদের ডিজে পার্টির সাথে নাচতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন!

অনেকে বলেন, “আমি তো গান-নাচ নিজের শখের জন্য করি। অন্যকে আকৃষ্ট করার জন্য তো করি না!”

এই যে নিজের শখ কথাটা, এই শখ টা বাসার ভিতর পর্যন্ত রাখি না কেনো?! অন্যের সামনে মানে নন-মাহরামদের সামনেই কেন করছি? আচ্ছা, এই সাজটা তাহলে বেড়াতে গেলেই কেনো করি? বাসার ভেতর করি না কেনো?

অনেককে বলতে শুনি, “আমি তো সাজগোজ করি নিজের জন্য, ছেলেদের দেখানোর জন্য তো করি না! আর আমি যে সেজে বাইরে যাচ্ছি, এতে আমার প্যারেন্টস, হাসবেন্ড এর তো অসম্মতি নেই!”

বুঝলাম, নাচ-গান-সাজগোছ করছি নিজের জন্য। কিন্তু এতে তো দুনিয়ার পরপুরুষ আকৃষ্ট হচ্ছেই! এতে তো গুনাহ অবশ্যই হচ্ছে (আল্লাহ মাফ করুন)। আর এগুলা করছি পরিবারের সম্মতিতেই, তাই তো? তাহলে কুরআনের একটা আয়াত এর কথা যেন আমরা ভুলে না যাই-

“যেদিন কিয়ামত উপস্থিত হবে,

সেদিন পলায়ন করবে মানুষ তার ভ্রাতা হতে,

তার মাতা, তার পিতা হবে,

তার পত্নী ও তার সন্তানদের হতে,

সেদিন ওদের প্রত্যেকে অপরের চিন্তা না করে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। সূরা আবাসাঃ ৩৩-৩৭”

অনেকে বলে, ‘অমুকে তো হলুদের অনুষ্ঠান পালন করে না, তাই ওকে দাওয়াত না দিলেও হবে।’- অমুকে হলুদের অনুষ্ঠান কেন পালন করেন না, কখনো কি আপনার জানার আগ্রহ হয়েছে?

যারা হলুদের অনুষ্ঠান পালন করেন, তাদের নসীহা করতে গেলে তারা বলে আমাদের বাপ-দাদারা তো এভাবেই অনুষ্ঠান পালন করতেন। তাহলে আমরা করলে কি সমস্যা?

প্রত্যেকের বাপ দাদা তার নিজের কাছে শ্রদ্ধেয়। কিন্তু প্রত্যেকের বাপ দাদা যে হকপন্থী, তার নিশ্চয়তা কোথায়? হকের মাপকাঠি কোন ব্যক্তিত্ব নয়, হকের মাপকাঠি হল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ। বাপ দাদার দোহাই দিয়ে হক প্রত্যাখ্যান করার রোগ অনেক পুরাতন। কুরআনের বহু জায়গায় সে কথা উল্লেখিত রয়াছে। মহান আল্লাহ দাদুপন্থিদের ব্যাপারে বলেছেন,

“আর যখন তাদের বলা হয়, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তার তোমরা অনুসরণ কর।’ তারা বলে, ‘(না-না) বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের যাতে (মতামত ও ধর্মাদর্শে ) পেয়েছি, তার অনুসরণ করব।’ যদিও তাদের পিতৃপুরুষগণ কিছুই বুঝত না এবং তারা সৎ পথেও ছিল না। (বাকারাহঃ ১৭০)

“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে ও রাসুলের দিকে এসো,’ তখন তারা বলে, ‘আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের যাতে পেয়েছি, তাই আমাদের জন্যও যথেষ্ট ।’ যদিও তাদের পূর্বপুরুষগণ কিছুই জানত না এবং সৎপথপ্রাপ্ত ও ছিলেন না, তবুও? (মায়িদাহঃ ১০৪)

যখন তাদেরকে বলা হয়, ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তোমরা তার অনুসরণ কর’, তখন তারা বলে, ‘আমাদের বাপ দাদাকে যাতে পেয়েছি, আমরা তো তাই মেনে চলব।’ যদিও শয়তান তাদেরকে দোজখ যন্ত্রণার দিকে আহবান করে (তবুও কি তারা বাপ দাদারই অনুসরণ করবে) ? (লুকমানঃ ২১)

বর্তমানে যেভাবে গায়ে হলুদ করা হয়, সেটা সম্পূর্ণ নাযায়েজ। মোমবাতি জালানো, গাইরে মাহরামরা গায়ে হলুদ লাগিয়ে দেয়া, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, যুবতীদের সাজগোজ় করে সৌন্দর্য প্রদর্শন, নিষিদ্ধ বাদ্য বাজানো, অশ্লীল গান এসবই হারাম। গায়ে হলুদের নামে এইসব করা ইসলামি সংষ্কৃতির অংশ নয়।

বিয়ে আর গায়ে হলুদের নামে চলছে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা। আল্লাহ বিধান পর্দা ত দূরের কথা, চলছে

গা স্পর্শ করে হলুদ মাখা। যা কবিরা গুণাহের অন্তর্ভুক্ত

আল্লাহ বলেন, “বলুন, আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা। (সূরা আ’রাফ-৩৩)

হারাম দিয়ে শুরু যে জিনিস ঐ জিনিসে বরকতের

বদলে গজব আসবে আর বর্তমানে এটাই লক্ষ্যনীয়

প্রত্যেকটা সংসারে। আল্লাহ আমাদের সকলকে সকল ধরনের অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা ত্যাগ করার তওফিক দান করুক আমীন।