আমার জন্ম আর শৈশব কেটেছে ঢাকার ফার্মগেটের নানাবাড়িতে। শহরের কোলাহলের মাঝেও আমাদের নানাবাড়ি ছিল যেন এক টুকরো গ্রাম। ছোট্ট মহল্লায় পনেরোটির মতো বাড়ির মধ্যে পাঁচ-ছয়টি ছিল দালান, বাকিগুলো আঁধা-পাকা বাড়ি।

আমার নানা বাড়িটা ছিল দশ কাঠা জায়গার ওপর বেড়ার চালের আধা-পাকা ঘর, আর চারপাশে সবুজের সমারোহ। পাঁচটা আম গাছ, একটা জাম্বুরা, একটা পেঁপে, একটা পেয়ারা, একটা আতাফল, দুটো সুপারি আর একটা মেহেদি গাছ - সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির নিজস্ব উঠান।

নানা-নানুর ২২ জন নাতি-নাতনি মিলে আমাদের ছিল এক ভরা সংসার, আর সেই সম্মিলিত জীবনে জমেছে কতশত স্মৃতি! আমের মওসুমে কাঁচা আমে চুন মাখিয়ে খাটের নিচে রেখে পাকাতে দেওয়া হতো, আমের সিজনে গাছে আম পাকলে কে সবচেয়ে বড় আম পেয়েছে সেই প্রতিযোগিতা হত। আব্বা নিজের হাতে আমাদের আট ভাই-বোনের জন্য আম-মুড়ি মেখে দিতেন, আর আমরা তৃপ্তি ভরে খেতাম সেই অমৃত খাবার।

বর্ষায় সবাই মিলে বৃষ্টিতে ভেজা, কিংবা ফুটবল খেলা - প্রতিটি মুহূর্ত ছিল যেন উৎসবের এক একটি অধ্যায়। এই সব ছোট ছোট আনন্দগুলো স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে।

সকালের পড়াশোনার পর গাছের পাতা দিয়ে রান্না করা খেলার ছলে তৈরি হতো এক অদ্ভুত জগত। বিকেলে ছিল খেলার অবাধ স্বাধীনতা, আর মাগরিবের আযান মানেই ঘরে ‘দে ছুট’! সন্ধ্যার নাস্তায় কলা-বাটার বান, কলা-পাউরুটি, আম্মার বানানো সুজি-রুটি - একেক দিন ছিল একেক স্বাদের বৈচিত্র্য।

ধর্মীয় শিক্ষার শুরুটাও ছিল মজার। হুজুর আসার আগে ওযু করে কে আগে উপস্থিত হতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা চলত। পাড়ার সবাই ছিলাম যেন এক পরিবারের সদস্য। মাংস চোর, ছি বুড়ি, কুমির তোর জলে নেমেছি, এপেন্টো বায়োস্কোপ, কুতকুত, ইচিং বিচিং, কানামাছি - কত রকমের খেলায় যে মেতে উঠতাম!

কখনো আমাদের ভাই-বোন ও কাজিনরা যারা একটু সিনিয়র ছিল, তারা আমাদের ছোটদের জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করতো যেমন- আবৃতি, গান, কুরআন তিলাওয়াত৷ পুরষ্কার হিসেবে দেয়া হত- কলম, পেন্সিল, ইরেজার, মোমবাতি (সেসময় তো ইলেকট্রিসিটি যেত অনেক, তাই মোমবাতি ছিল খুব জরুরি একটা জিনিস)

মহল্লার ছেলেরা মিলে একটা কমিটি করেছিল, আমার ছোট মামার সেই কমিটির নাম দিয়েছিলেন ‘দুর্বার যুব সংঘ।’ কমিটি থেকে প্রতি বছর নানান ইভেন্টের আয়োজন করা হতো- ছেলেদের জন্য ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, দাবা খেলা প্রতিযোগিতা৷ আমার ভাইদের পাওয়া ‘ক্রেস্ট’ এখনো বাসার শো-কেসে সাজানো আছে।

বাচ্চাদের জন্য ছবি আঁকা, হাতের লেখা, কবিতা আবৃতি, গান ইত্যাদি প্রতিযোগিতা৷ বছরে একবার সেই সংঘ থেকে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো৷

এভাবে করে সেই মহল্লার সবাই একে-অন্যের ভাল-মন্দ খোঁজ খবর রাখতে পারতো৷ কোনো উন্নয়ন মূলক কাজে প্রোডাক্টিভ আইডিয়া শেয়ার করতে পারতো৷

শীতকাল মানেই ছিল নানুর হাতে গরম ভাপা পিঠা খাওয়ার ধুম। শীতের সকালে সবাই মিলে সেই পিঠার স্বাদ নেওয়া ছিল এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। শুক্রবারের খুদের ভাত, সাথে কালো জিরা, শুকনা মরিচ আর ধনিয়া পাতার ভর্তা - আহা, কী স্বর্গীয় স্বাদ! পাটায় বাটা ভর্তার শেষ অংশটুকুতে নানু গরম ভাত মেখে লোকমা বানিয়ে উনার নাতি-নাতনীদের মুখে তুলে দিতেন, সেই ভালোবাসার স্বাদ আজও জিভে লেগে আছে।

শীতের সময়ে আব্বা রাতে বাইরে থেকে চিতই পিঠা নিয়ে আসতেন, আর সেই রাতেই আম্মা-আব্বা মিলে তৈরি করতেন দুধ-চিতই। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মজার দুধ-চিতই দিয়ে নাস্তা খেতাম।

ঈদের স্মৃতিগুলোও কম রঙিন ছিল না। রোজার ঈদের চাঁদ রাতে বাড়ির মূল ফটকে “ঈদ মোবারক” লেখা ব্যানার টাঙানো হতো। ঈদের দিন কাজিনরা মিলে পাড়ার সবার বাড়িতে সালামি সংগ্রহ করা, আর সন্ধ্যায় সেই সালামির টাকা দিয়ে কোক আর চিপস কিনে খাওয়া - এই ছিল আমাদের ঈদের আনন্দের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কোরবানির ঈদে কে কয়টা গরু দেখলাম, তার হিসাব রাখা হতো। পাড়ার সবচেয়ে বড় গরু দেখতে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে থাকতাম। মহল্লার গলিতে লাইন ধরে গরু কোরবানি দেওয়া হতো, আর আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। সন্ধ্যায় পাড়ার সব বাড়িতে কাজিনরা মিলে মাংস বিলি করতে যাওয়া ছিল এক সামাজিক আনন্দ।

ধীরে ধীরে সেই বেড়ার ঘরগুলো বদলে গেল ইটের দালানে। উঁচু দালান উঠবে বলে গাছগুলোও কেটে ফেলা হলো, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় আমগাছটি হারানোর দুঃখ আজও মনকে বিষণ্ণ করে।

স্কুল ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। বৃষ্টির দিনে স্কুলে যেতে না পারলে একা একা কাঁদতাম। স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল আমার সবচেয়ে পছন্দের ইভেন্ট। ক্লাস ওয়ানে বিস্কুট দৌড়ে তৃতীয় হওয়ার পর থেকে শুরু করে ক্লাস ফাইভ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত রিলে রেসে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, আরও অনেক খেলায় পুরস্কার জেতা - সেই ছোটবেলার প্রতিটি পুরস্কার আম্মার বাসার শোকেসে আজও সযত্নে সাজানো আছে। ক্লাস নাইনে হলিক্রস স্কুলে ভর্তির পর ক্লাস টেনের ‘খো খো’ খেলায় আমাদের দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাও ছিল এক দারুণ অর্জন।

আজও সেইসব স্মৃতি মনে পড়লে এক অদ্ভুত ভালো লাগায় মন ভরে যায়। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে, কিন্তু নানাবাড়ির সেই হাসি-খুশি আর বাঁধনহারা শৈশব, আজও আমার হৃদয়ে এক সোনালি অধ্যায় হয়ে আছে। এই শহরের কোলাহলে সেইসব স্মৃতিই আমার মনকে প্রশান্তি দেয়, আর মনে করিয়ে দেয়, কিছু ভালোবাসা আর কিছু স্মৃতি চিরন্তন, যা কখনো পুরনো হয় না।

আমার নানু ছিলেন আদরের ভান্ডার। দেখা হলেই জড়িয়ে ধরে দুই গালে চুমু খেতেন। বাড়িতে এত কাজের লোক থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের হাতে সবজি কাটতেন, রান্না করতেন, নানার জন্য নিজ হাতে চা বানাতেন। ২০১০ সালে নানু যখন পরপারে চলে গেলেন, তাঁর সেই আদর আজও আমি অনুভব করি।

আমার নানা ছিলেন এক অসাধারণ মানসিক শক্তির অধিকারী। ২০১০ সালে নানুর মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে কী সুন্দরভাবেই না সামলে নিয়েছিলেন! নানুকে ছাড়া পাঁচ বছর সাভারে তৈরি করা নিজ বাড়িতে একা কাটিয়েছিলেন, কিন্তু কাউকে কখনো তাঁর কষ্ট বুঝতে দেননি। ২০১৫ সালে আমার নানা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

আমার আব্বা এয়ারলাইন্সে চাকরি করতেন। দেশের বাইরে এত পোস্টিং থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদের আট ভাই-বোনের স্কুলের রোল নম্বর-সেকশন মনে রাখতেন। কখনো কখনো ক্লাস শেষে অফিসের গাড়ি নিয়ে স্কুলে এসে আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতেন। আব্বার এয়ারলাইন্সের চাকরির প্রভাব হয়তো আজও রয়ে গেছে, কারণ আকাশে উড়ন্ত প্লেন দেখলে আর রাস্তায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গাড়ি দেখলে আমি আজও অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। ২০১৬ সালে আমার আব্বাও পরপারে পাড়ি জমান। আল্লাহ আমার নানা-নানু-আব্বাকে বেহেশত নসীব করুন, আমীন৷

নানা বাড়িতে এখন পাশাপাশি চারটি দালান। একটি আমার মা-খালাদের, আর বাকি তিনটি আমার তিন মামার। আগে বাড়ির সামনে উঠান বা দুয়ার ছিল, এখন গাড়ি ঢোকার জন্য যথেষ্ট জায়গা রাখা হয়েছে, যেখানে ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন খেলা যায়। পার্থক্য শুধু এইটুকু - আগে আমরা খেলতাম মাটির দুয়ারে, এখন

আমাদের সন্তানেরা খেলে পাকা পিচঢালা জায়গায়।

ব্যস্ততার জন্য এখন তো অনেকের সাথেই দেখা হয় না অনেকদিন। কিন্তু মোনাজাতে আমার পরিবার, আমার কাজিন, খালা-খালু-মামা-মামী, চাচা-চাচী-ফুফু-ফুফা, আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব সবাইকে আমি প্রতিদিন স্মরণ করি আলহামদুলিল্লাহ।

“কোন মুসলিম তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দোয়া করলে তা কবুল করা হয় এবং তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই সে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোয়া করে তখন সে নিযুক্ত ফেরেশতা বলে, আমীন অর্থাৎ হে আল্লাহ! কবুল করুন এবং তোমার জন্য অনুরূপ।” (সহীহ মুসলিম ৮৮)