বড় আপুর এংগেজমেন্টের দিন বাবা মায়ের সাথে খুব রাগারাগি করলেন। ছোট চাচা তার দুই মেয়েকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছে হুট করে, এটাই রাগের কারণ। আসলে মা-ই কিছুদিন আগে চাচীকে জানিয়েছেন আপুর এংগেজমেন্টের কথা। চাচী চাচাকে বলেছেন। চাচা নিজে থেকেই চলে এসেছেন। চাচী অসুস্থ তাই আসতে পারেনি।
হোসেনের কোনো কমন-সেন্স নাই তুমি জানো না?তুমি কোন হিসাবে ওর বউকে এংগেজমেন্টের কথাটা বলতে গেলা?
বাবার কথা শুনে মা-ও খেপে গেলেন। এমনিতেই সারাদিন এংগেজমেন্ট উপলক্ষে ঘরদোর সাজানো, রান্নাবান্নার তদারকি করতে করতে মায়ের উপর খুব ধকল গেছে। তাই মা-ও বাবার কথার পিঠে মেজাজ দেখিয়ে বললেন, ফ্যামিলিতে সবাই জানে সারার কালকে এংগেজমেন্ট। সেখানে নিলুফারের কাছে কথাটা কীভাবে গোপন রাখব? তুমি যে তোমার আপন ভাইকে মেয়ের এংগেজমেন্টের কথা বলবা না তাতো জানতাম না।
বলেছো, বুঝলাম। দুই মেয়েকে এনেছে কোন হিসাবে? তুমি বলো নাই শুধু কাছের কিছু আত্মীয় মিলে আলোচনা হবে। বড়দের আলাপ-আলোচনার মধ্যে ছোটদের কী কাজ?
আমি কি বলেছি মেয়েদের নিয়ে আসতে? হোসেন ভাই বললেন, আয়েশা-ফাতেমা আবদার করেছে। মেয়েদের আবদার ফেলতে পারেনি বলে নিয়ে এসেছে।
বাবা মায়ের কথা শুনে গজগজ করতে থাকলেন।
হোসেন চাচা আর বাবা আপন ভাই হলেও, হোসেন চাচাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক খুবই সীমিত। ঈদ কিংবা কারো বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়া আমাদের দেখাসাক্ষাত হয় না। সত্যি বলতে, হোসেন চাচা যে বাবার আপন ভাই কেউ না জানলে বিশ্বাসই করবে না। আমাদেরই মাঝে মাঝে লজ্জা লাগে যে হোসেন চাচা আমাদের আপন চাচা। অপরিচিত মানুষের সামনে উনাকে নিয়ে যেতে বিব্রত বোধ করি। আপুর জন্য বিয়ের সিভি বাবানোর সময়ও এ নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে যে হোসেন চাচার ব্যাপারে ঠিক কী লেখা যায়।
হোসেন চাচার স্ট্যাটাস কোনো দিক দিয়েই আমার বাবার সাথে যায় না। সামান্য একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। সেখানে আমাদের বাবা নামী ব্যবসায়ী। মেধা, যোগ্যতা, সম্মান, টাকাপয়সা সবদিক থেকেই হোসের চাচার থেকে অনেক এগিয়ে। তাছাড়া হোসেন চাচার পোশাক-আশাকও বিড়ম্বনার আরেকটা কারণ। যেকোনো অনুষ্ঠানেই উনি একটা সাদা পাঞ্জাবি আর টুপি পরে হাজির হয়ে যান। নতুন আত্মীয়দের সামনে চাচার যাওয়া কীভাবে ঠেকাবেন বাবা বুঝে উঠতে পারছেন না বলেই রেগে গেছেন। সেই রাগ এখন মায়ের উপর ঝাড়ছেন।
বড় আপু আসায় দুজনের ঝগড়া থেমে গেল।
বাবা, মা, এখন চাচাকে নিয়ে তোমরা আর ঝগড়াঝাটি কোরো না প্লিজ। এংগেজমেন্টের আগে আর কোনো ঝামেলা ভালো লাগছে না।
আর চাচাই বা এসব শুনলে কী মনে করবেন? মাত্র তিনজন মানুষের জন্য এমন কোনো হেরফের হয়ে যাবে না। এখন এই টপিকটা বাদ দাও তোমরা দোহাই লাগে।
বাবা আদরের কন্যার দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলেন। মায়ের সাথে এ নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না। তবে আপনমনে ঠিকই বিড়বিড় করলেন, এত সেন্সলেস মানুষ হয় কীভাবে। দাওয়াত ছাড়া হুট করে চলে আসে।
হোসেন চাচা আপুর এংগেজমেন্ট উপলক্ষে দুইটা হাঁস আর তিন প্যাকেট মিষ্টি এনেছেন। বারবার বলেছেন, ভাবী, এই হাঁসদুটো রান্না করবেন। খুব ভালো হাঁস, চর্বিঅলা দেখে কিনেছি।
মা সেই হাঁস রাধতে বলার জন্য রান্নাঘরে চলে গেলেন। দুইজন বাবুর্চি অনুষ্ঠানের জন্য রান্নাবান্না করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অতিথিরা চলে আসবে।
এর আগে ছেলে আর ছেলের মা-বাবা আর বোন মিলে আপুকে দেখে গেছে। আজকে আংটি পরিয়ে একেবারে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলল সবাই। ছেলেপক্ষের সবাই আপুকে খুব পছন্দ করেছে। সামনের মাসেই আপুর বিয়ের তারিখ ফেলা হলো।
আপুর বিয়েতে ধুমধাম অনুষ্ঠান হলো। একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। আমিও আপুর বিয়ের জন্য কাজিনদের সাথে বেশ কয়েকটা নাচের মুদ্রা প্র্যাকটিস করা শুরু করলাম। হলুদের দিন স্টেজে পারফর্ম করতে হবে। আমাদের চাচাতো, ফুপাতো, মামাতো, খালাতো যত কাজিন আছে, সবাই কোনো না কোনো ভাবে প্রোগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিলো। শুধু এলো না হোসেন চাচার মেয়েরা। আয়েশা আর ফাতেমা। এই দুই বোনকে ডেকেও কোনোকিছুর জন্য রাজি করানো গেল না।
হোসেন চাচার নাচগানে এলার্জি আছে। ধর্মকর্ম নিয়ে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করেন উনি। দুনিয়া নিয়ে একটু বেশি উদাসীন। নিজে মসজিদে নামাজ আদায় করবেন, দাঁড়ি রাখবেন, এই পর্যন্ত ঠিক ছিল, বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলোকেও মাথায় হিজাব পরাবেন, নাচগান আনন্দ-ফুর্তি করতে দিবেন না, এটা কেমন কথা? মেয়েদেরকে আসলে মানুষ মনে করে না এই হুজুরগুলা।
আয়েশা আর ফাতেমা অবশ্য বাবা বলতে অজ্ঞান! এত রেস্ট্রিকশন দেয়া সত্ত্বেও দুই মেয়েই কেন এত বাবাভক্ত সেটা একটা রহস্য। হোসেন চাচার পরিবার হলুদের অনুষ্ঠানে আসবে না শুনে বাবা বললেন, এদেরকে সমাজে জায়গাই দেয়া উচিত না। যতসব গোঁড়ামি নিয়ে বসে থাকে। না আসলেই ভালো, আমাদের অনুষ্ঠানের মধ্যে কালো বোরকা আর সাদা পাঞ্জাবি পরে ঘুরঘুর করলে আমাদেরই নাক কাটা যেত।
দেখতে দেখতে বড় আপুর বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর আপুরা হানিমুনে থাইল্যান্ডে গেল। থাইল্যান্ড থেকে দুলাভাই আমার জন্য খুব সুন্দর একটা স্মার্ট ওয়াচ কিনে আনল। আপু আর দুলাভাইকে দেখে মনে হতো যেন বেস্ট কাপল। আর ভাইয়া হলো বেস্ট দুলাভাই।
আপু অবশ্য এই কথা মানতে চাইত না। আড়াল করে দীর্ঘস্বাস ফেলত। একদিন আপুর ফোন পেয়ে ধরলাম, কোনো কথা না বলে শুধু বলল, সায়ান, আম্মু কোথায়? আম্মুকে ফোনে পাচ্ছি না। আম্মুর কাছে ফোনটা দে তো। আপুর গলা শুনেই মনে হল আপু কান্নাকাটি করেছে।
আম্মুর সাথে কী কথা হল জানিনা। দেখি মা-বাবা দুজনের মুখ থমথমে। মা বললেন, বিয়ের ছয় মাসের মাথায় যদি ছেলে এমন করে তাহলে পরে কী করবে? ওখানে আমার মেয়েটা সুখে নাই। তুমি কিছু করো।
বাবা গম্ভীর স্বরে বললেন, ঝামেলা তো সংসারে কমবেশি হবেই। সারাকে বলো এসব নিয়ে যেন বেশি বাড়াবাড়ি না করে। সবে বিয়ে হলো, এখনই এত কথা উঠলে সবাই আমাদের নিয়ে ছি-ছি করবে।
কয়েক মাস পর শুনি আপু কনসিভ করেছে। আমি মামা হবার আনন্দে আত্মহারা। আপু কষ্টে আছে বলে মনেও হতো না। সবসময় দেখতাম ফেসবুক আর ইন্সটাগ্রামে ছবি দেয়। কী হাসিখুশি সব ছবি! ভাইয়াকেও আমার খারাপ মানুষ মনে হয় না। তবে আপু মাঝেসাঝেই আম্মুর কাছে ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করত। আম্মু বলত, বাচ্চাটা হয়ে যাক, এরপর দেখবি ধ্রুবর মন গলবে। একটু মানিয়ে নে।
বাচ্চা হওয়ার কিছুদিন আগে বড় আপু আমাদের বাসায় চলে এলো। ভীষণ মায়াকাড়া একটা ছেলে হল আপুর। নাম রাখা হলো সূর্য। সূর্য সবার চোখের মণি। ওকে নিয়ে আমরা সারাদিন আনন্দ করতাম। কেউ খাওয়াচ্ছে, কেউ গায়ে তেল মালিশ দিচ্ছে, মনে হতো ওকে ঘিরে বাসায় কোনো উৎসব চলছে।
এত হৈ-হুল্লোড়ের মাঝেও দেখলাম, আপুকে কেমন মনমরা লাগে। আপু নিজের বাসায় ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহ দেখাত না। আগের মতো উচ্ছ্বল-হাসিখুশি ভাবটাও আর নেই। চোখের নিচে কালি জমেছে। গাল ভেঙে গেছে। হঠাৎ করেই আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো আমার বোনটা সত্যি খুব কষ্টে আছে। সূর্যর দুই মাস বয়স হলে একদিন দুলাভাই এসে ওদের নিয়ে গেল। আমাদের বাসাটা ফাঁকা হয়ে গেল। এবার কেন যেন দুলাভাইকে দেখে খুশি হওয়ার বদলে উল্টো বিরক্ত লাগল।
আরো ছয় মাস পরের কথা। আপু একদিন কাকডাকা ভোরে সূর্যকে কোলে নিয়ে হাজির। আপুর কাঁদো কাঁদো চেহারা, এলোমেলো আচরণ দেখেই যা বোঝার বুঝে ফেললাম। এতদিন বড়দের কথায় কান দিই নি। সেদিন হয়ত আপু আর লুকানোর চেষ্টা করে নি বলেই দেখতে পেলাম আপুর গলায় লম্বা কালশিটে দাগ। আপু কি তবে ফাসি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে?
দুপুর নাগাদ ঘরে সবাই মিলে বসলাম। বাবা-মা আমার থেকে আড়াল করতে চাইলেও আপু আমাকে ডাক দিলো, সায়ান, এদিকে এসে বস। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা, ও আর ছোট নেই। ও শুনুক ওর দুলাভাই কেমন লোক।
আপুর গলার দাগটা কোথা থেকে এসেছে আমার আর বুঝতে বাকি রইল না। সেই বিয়ের প্রথম থেকেই এরকম হয়ে চলছে। বাচ্চা পেটে আসার পরেও নিস্তার দেয় নি পশুটা, এখনও যখন-তখন গায়ে হাত তুলছে।
মা বাবাকে বললেন, সারা কিছুদিন এখানেই থাকুক। ধ্রুব এসে কথা বলুক, এরপর দেখা যাবে। বাবাও একমত হলেন। এক সপ্তাহ-দুই সপ্তাহ করে মাস পার হয়ে গেল। দুলাভাইয়ের আসার নামগন্ধ নাই। সে কি তার কাজে মোটেও অনুতপ্ত না? আমি রাগে ক্রোধে অস্থির হয়ে গেলাম। আপুকে বললাম, আপু দেইখো, আমি এই ব্যাটাকে কীভাবে শায়েস্তা করি।
আপু ম্লান হেসে বলল, কীভাবে শায়েস্তা করবি?
ছেলেপেলে দিয়ে পিটাব।
পিটালে কি ও কিছু বুঝবে? উল্টো তখন বলার সুযোগ পাবে যে, আমাদের পরিবারই খারাপ। আমার ভাই মাস্তান, রংবাজি করে বেড়ায়। তুই এসব কিছুই করিস না ভাই। আমি এখানে আছি, ভালোই আছি। ওর কাছে ফিরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও আমার বাকি নাই।
কিন্তু আপু না চাইলেও ফিরে যেতে হলো। বলতে গেলে, বাবা একরকম জোর করেই আপুকে ফিরে যেতে বাধ্য করলেন। আপু চলে গেলে মা-কে বললেন, এইভাবে মেয়েকে বাসায় রাখলে সমাজে আর মুখ দেখাতে পারতাম? সোসাইটিতে আমাদের একটা স্ট্যাটাস আছে। ম্যারিড মেয়েকে কতদিন বাপের বাড়ি বসায় রাখব?
মা-ও সায় জানালেন। আপুকে ফোন দিয়ে বারবার বোঝাতেন, মেয়েদেরকে একটু মানিয়ে নিতে হয়। আপু ডিভোর্স নিতে চাইত বারবার। তখন বলা হতো, একটা বাচ্চা নিয়ে ডিভোর্সের মানে বুঝিস? এসব কথা জানাজানি হলে মানুষ তোকেই কথা শোনাবে। পুরা ফ্যামিলিতে আর মুখ দেখাতে পারব না। আমাদের একটা ইজ্জত আছে সমাজে। বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে আরেকটু ধৈর্য্য ধর। মানিয়ে চলার চেষ্টা কর।
বাবা তো বলেই দিল, ডিভোর্স হলে এই বাড়িতে আর আপুর জায়গা হবে না।
মা-বাবার আচরণ দেখে মনটা তেতো হয়ে যেতো। আমার আপুটা না জানি কবে মরেই যাবে, আর উনারা দুজন আছেন উনাদের মানসম্মান নিয়ে। একদিন সাহস করে বলেই ফেললাম, বাবা, আপুকে নিয়ে আসো না কেন এই বাসায়? এখানেই থাকুক না আমাদের সাথে। মানুষের কি আর কারো ডিভোর্স হয় না?
বাবা গম্ভীর স্বরে বললেন, ছোট হয়ে এত জ্ঞান দিতে এসো না। কখন কী করতে হবে আমি জানি।
আরো দুই বছর কেটে গেল। সূর্য এখন কথা বলতে পারে। ফোন দিলে পটর পটর করে কত কথা যে বলে। কিন্তু অনেকদিন সূর্যের সাথে দেখা হয় না। আপুই আর আসে না। হয়ত এখন মানিয়ে চলা শিখে গেছে।
আমি কলেজের শেষ বর্ষে উঠেছি। বাবা-মায়ের প্রতি একরকম অভিমান থেকেই বাসায় থাকা কমিয়ে দিয়েছি। সারাদিন বাইরে বাইরে থাকি। ক্লাস শেষ হলে টিউশন করাই, টাকা লাগবে না তবু করাই। বাসায় ফিরতে ইচ্ছা করে না। আমার বড় আপুর জায়গা যেই বাড়িতে হয় নি, সেখানে আমারও থাকতে মন চায় না।
কিছুদিন পর শুনি আপু আবারও প্রেগনেন্ট। এই প্রেগনেন্ট অবস্থাতেই ঈদের দিন ভাইয়া আপুকে প্রচণ্ড মারধোর করে। আপুর কথা জানাতে কে যেন ফোন করে। ঈদের দিন বেশ কিছু আত্মীয়-স্বজনও তখন বাসায়। সবার সামনেই এই ঘটনা। হোসেন চাচাও সব শুনলেন। তিনি নিজে থেকেই বললেন, চলেন ভাই, সারা মাননির বাসায় চলেন। আমিও যাব আপনাদের সাথে।
আমরা কয়েকজন মিলে আপুর শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দেখি রক্তাক্ত অবস্থা। আপুর মাথা ফেটে গেছে। সূর্য ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করছে। ফার্মেসির ডাক্তার ডেকে দ্রুত আপুকে ব্যান্ডেজ আর মেডিসিন দেয়া হল।
হোসেন চাচা দুলাভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বললেন, বাবাজি, তোমার স্ত্রীকে ঠিকমতো দেখাশোনা করার দায়িত্ব তোমার। ও যদি কোনো ভুলত্রুটি করে থাকে, তবুও তুমি এভাবে ওর গায়ে হাত তুলতে পারো না। অনেক হয়েছে, সারা মা আর এখানে থাকবে না। এরপর ওর যা সিদ্ধান্ত হয় তোমাকে আমরা জানিয়ে দেব।
এই কথার পরেও ধ্রুব ভাইয়ের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। সে তো জানেই দুই দিন না হোক দুই মাস পর আপু ওই সংসারেই ফিরবে।
বাবা মুখ গোমড়া করে আছেন। হোসেন চাচার কথা বাবার পছন্দ হয় নি। খানিকটা উষ্মার সাথে বললেন, নাতিপুতি সহ মেয়ে বাপের বাড়িতে থাকলে লোকে কী বলবে? মেয়ের ডিভোর্স হলে কারো কাছে মুখ দেখাতে পারব?
হোসেন চাচা বাবার কথায় গ্রাহ্য করলেন না, বললেন, ভাই, সারা মামনি আপনার কাছে না, আমার কাছেই থাকবে। দুই মেয়েকে যেভাবে দেখি, এখন থেকে তিন মেয়েকে সেভাবেই দেখব। রিজিকের মালিক আল্লাহ। ইনশাআল্লাহ তিনিই দিন চালিয়ে নিবেন।
বড় আপু চাচার কথা শুনে খুশিতে কেঁদে দিলো। এতদিন পর অন্তত কেউ সত্যি সত্যি ওর ভালোর জন্য চিন্তা করেছে।
হোসেন চাচা বাবার মতো লোকলজ্জাকে ভয় পান না। এই হুজুর হয়ে সারাজীবন তিনি তো কম কথা সহ্য করেন নি। কে কী বলল ওসব উনি পরোয়া করেন না। বাবার মতো স্ট্যাটাসের প্রতি অতিভক্তিও নেই উনার। ডিভোর্সকে উনিও অপছন্দ করেন ঠিক, কিন্তু নির্যাতন সয়ে সংসার করাকে সমর্থন করেন না।
আজ অভিভাবক হিসেবে আমার বাবার যে কাজটা করার কথা ছিল, হোসেন চাচা ‘চাচা’ হয়ে সেই কাজটাই করলেন।
সারাজীবন যাকে জেনে এসেছি, ননসেন্স, উদাসীন, মূর্খ হুজুর হিসেবে, আজ সে মানুষটাই কত সহজভাবে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলেন। এতদিন উনাকে নিয়ে কত বাজে বকেছি ভেবে মনে মনে লজ্জিত হলাম। হোসেন চাচার দুমড়ে-মুচড়ে থাকা সাদা পাঞ্জাবিটা দেখতে কেন যেন আজ একটুও খারাপ লাগছে না, মনে হচ্ছে মানুষের বেশে একজন ফেরেশতা আমার বোনের জন্য হাজির হয়েছে। যিনি জানেন, কীভাবে কন্যাদের আগলে রাখতে হয়। যিনি জানেন, কীভাবে কন্যাদের ভালো রাখতে হয়।
আমার বোনটা সুখে থাকুক।
বকুল ফুল ওর কোলে সুখ হয়ে ঝরুক।