ভোর ৪ টা ৪৫ বাজে, ফজরের নামাজের জন্য জায়নামাজে দাড়িয়েছে তাসমিয়া। সূরা ফাতিহা পড়ে, সূরা বাক্বারা তিলাওয়াত শুরু করল সে। আর তখনই বুকের বা পাশে ব্যথা শুরু হয়ে গেল। একটু পরে পেটে, তার একটু পর পায়ে, আরেকবার মাথায় ব্যথা হতে লাগল।চার রাকাআত নামাজ পড়তে পড়তে শরীরের কয়েক স্থানে ব্যথা হলো।

ফজরের পরে ক্বুরআন নিয়ে বসল সে। সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করবে বলে।একটু তিলাওয়াত করার পরই বুকটা ভারি মনে হতে লাগলো।

আচ্ছা, আমার সাথে কিছুদিন ধরে এমন হচ্ছে কেন?

একটা সন্দেহ মনে উঁকি দিয়েই আবার মিলিয়ে গেলো। তাসমিয়া সেটাকে পাত্তা দিল না।

দুপুর বেলা, তাসমিয়ার বাবা মাত্র বাসায় ফিরেছেন। ইদানিং কেন জানি, সে তার বাবাকে একদমই সহ্য করতে পারছে না, এমনকি তার বাবার পায়ের আওয়াজ, কথা, হাসি,উপস্থিতি কিছুই না। শুধু তার বাবা বললে ভুল হবে, সে তার পরিবারের কাউকেই পছন্দ করে না। এমনকি নিজেকে ও না।

কেন জানি দুপুরবেলা শুধুশুধু প্রচন্ড রাগ হয় ওর। কেন রাগ হয় সে জানে না। তবে রাগ হলে ওর ৩টা কাজ করতে ইচ্ছে করেঃ

১) প্রচন্ড বাজেভাবে গালিগালাজ। মাঝে মাঝে এমন কটু শব্দ মাথায় আসে, পরে যখন রাগ স্বাভাবিক হয় তখন নিজেরই অবাক লাগে।অথচ সে ছোটবেলা থেকেই ছিলো শান্ত স্বভাবের মানুষ।

২) বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া! কেন জানি ওর দুপুরবেলা ও সন্ধ্যাবেলা বাসায় থাকাটা অসহ্য লাগে।মন চায় বন-জঙ্গলে কোথাও চলে যেতে।

৩) আত্ম*হ*ত্যা করা! জ্বি, ঠিকই শুনেছেন। এই কয়েকদিনে তার মাথায় এ চিন্তাটা অনেকবারই এসেছে।

আসরের পরপরই প্রতিদিন নিয়ম করে গায়ে জ্বর আসে তাসমিয়ার। পেটের সমস্যা তো এখনো আছে, আজ ১৫ দিন হতে চললো।কত ঔষুধ খেল সে,ডাক্তার দেখাল, কোনো কাজ হলো ন। শরীরটা তার ভীষণ দূর্বল । তাছাড়া ইদানিং কেন জানি তার বিয়ের প্রতি অনীহা কাজ করছে ভীষণভাবে।

সন্ধ্যার পরপরই হয় ওর খুব রাগ হবে নয়তো কান্না আসবে। এইতো গতকালের ঘটনা। মাগরিবের নামাজের পরে সুরা ওয়াক্বিয়াহ তিলাওয়াত করছিলো সে। কয়েক আয়াত তিলাওয়াত করতেই প্রচন্ড কান্না পায় ওর। জোরে জোরে কাঁদতে থাকে সে।কেন কাঁদতেছে সে জানে না।২৩ বছর বয়সী মেয়েটার ইদানিং এমন পরিবর্তন তার মাকে বিচলিত করে তুলে।

তবে এগুলো যে সি*হরে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষ্মণ, সেটা অজানা নয় তাসমিয়ার।তবু সে নিজেকে শান্তনা দেয়,ধুর! আমাকে কে যা*দু করবে? আমার তো কারো সাথে অবৈ*ধ স*ম্পর্ক ও নাই।আর প্রতিবেশীদের শত্রুতা থাকলে তো মা-বাবার সাথে, আমার সাথে তো আর না। সে এমনটাই ভাবতো।

তবে গতকাল রাতের ঘটনায় এই সন্দেহ তার পুরোপুরি দূর হয়ে গেছে। । মাঝরাতে খুব ভয় পেয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠে তাসমিয়া। স্বপ্নে সে ভয়ংকর কিছু দেখেছে। স্বপ্নে প্রাইভেসি লঙ্ঘন হওয়াটা যেন প্রায় প্রতিরাতের ঘটনা। ঘুম থেকে জেগেই বাসার পাশে ২টা বিড়ালের ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পায় সে।বিড়াল দুটি খুব জোরে চিৎকার করছে। একটু পরে আরেকটা অদ্ভুত কন্ঠের আওয়াজ শুনে সে। খুবই ভয়ঙ্কর। তার কিছুক্ষণ পরে মোরগের ডাকের আওয়াজ ; অথচ তখন রাত ২টা বাজে!

সে বুঝে গেলো তাকে যা*দু করা হয়েছে। গত কয়েকদিনের বিভিন্ন অদ্ভুত ঘটনা বারবার তাকে এটাই জানান দিচ্ছিলো।আজ সে নিশ্চিত হলো।পরে জানতে পারলো, ২ মাস আগে তার জন্য যে বিয়ের প্রস্তাবটা আসছিলো, তাতে সম্মত না হওয়ায় তাকে কালোযাদু করা হয়েছে! পাত্রের সবই ছিলো,শুধু দ্বীনদারিতা ছিলো না। তাই তাসমিয়া এতে সম্মতি দেয়নি, যদিও পাত্রপক্ষ তাকে অনেক পছন্দ করেছিলো এবং তারা বিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন।তাই পাত্র তার উপর বিয়ের বন্ধের যাদু করে দেন, যাতে আর কোনোদিন তার বিয়ে না হয়।

মানুষের প্রতি মানুষের এত হিংসা কেন?অন্যের সুখ কেন অনেকের গলায় কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়?এই প্রশ্নগুলো আমরা বারবার করি, কিন্তু উত্তরগুলো অনেক সময় এতই কষ্টদায়ক যে বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়।

সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা হলো—বেশিরভাগ সময় যে ক্ষতি করে, সে হয় ‘নিজের’ কেউ। রক্তের সম্পর্ক, আত্মীয়তা, প্রতিবেশী, এমনকি বন্ধুত্বের মুখোশে ঢেকে থাকা কেউ।

দুনিয়ায় সবচেয়ে জঘন্য বিষয়গুলোর একটি হলো—অন্যের শান্তি, সাফল্য, রূপ, রিজিক, সম্মান—এসব দেখে ঈর্ষায় জ্বলে ওঠা।

আর সেই ঈর্ষাই কখনো কখনো মানুষকে ঠেলে দেয় কালোজাদুর মতো ভয়ঙ্কর শয়তানী কাজে। অনেকে বলে—“এসব তো কুসংস্কার!” কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ নিজেই সিহরের শিকার হয়েছিলেন।

সহিহ বুখারী ও মুসলিমে প্রমাণিত যে, ইহুদি লাবিদ ইবনু আ‘সাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর যাদু করেছিল, যাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই যাদুর প্রভাব যে কত ভয়ঙ্কর ও কষ্টকর, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে।

যে ব্যক্তি কালোজাদু (সিহর) করে, সে এটাকে হালকা বা তুচ্ছ কোনো বিষয় মনে করে। অথচ কালোজাদু কোনো সাধারণ অপরাধ নয়—এটি একটি কবিরা গুনাহ, এমনকি ঈমান নষ্ট করে দেওয়া শয়তানী কাজ। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:“তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো…”

সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন: “হে আল্লাহর রাসূল, সেগুলো কী?”

তিনি বললেন:”…শিরক করা, যাদু করা, নিষ্পাপ মানুষকে হত্যা করা…”—সহিহ বুখারি ও মুসলিম

অনেক ফকিহ বলেন—“যে ব্যক্তি কালোজাদু করে এবং তাওবা ছাড়া মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” দুনিয়ার ক্ষতি করতে গিয়ে কেউ যদি নিজের আখিরাত ধ্বংস করে ফেলে, তবে সে সত্যিই সবচেয়ে বড় ঠক। আল্লাহ তায়ালা যেন এসব মানুষদের হিদায়াত দেন এবং তাদের অনিষ্ট থেকে অন্যদের রক্ষা করেন। (পরিমার্জিত)