আচ্ছা, আমাদের পিতা-মাতার মৃত্যুর তারিখের সাথে যদি তাদের কোনো সন্তান বা তাদের নাতি-নাতনিদের জন্ম তারিখ মিলে যায়, সেই সন্তান বা নাতি-নাতনিরা কি তাদের জন্মদিন আর কখনো পালন করতে চাইবে?
শুনলাম, গতকাল মাইলস্টোন স্কুলের দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া এক বাচ্চার জন্মদিন ছিল৷ মা-বাবা বাচ্চার জন্মদিন পালনের জন্য কি কেক কিনে রেখেছিলেন? বাসায় পোলাও-কোরমা রান্না করেছিলেন? আর স্কুল ছুটির সময় দেখলেন তাদের সন্তান না ফেরার দেশে চলে গেছে৷ কেমন কষ্ট হল তাদের? সেই কেক, রান্না করা মজাদার খাবার গুলো তারা কি করলেন?
আচ্ছা, নিহতের পরিবারের কেউ যদি দেখে বাচ্চা নিহত হবার দিন সেই বাচ্চার সহপাঠী বা স্কুলের কোনো বাচ্চা জন্মদিন পালন করছে? একদিকে নিহত সন্তান নিয়ে শোক করছে এক পরিবার, আরেক দিকে একই স্কুলের বাচ্চা পরিবার ও ফ্রেন্ড নিয়ে জন্মদিন উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন করছে!
আমাদের বিবেক এই এতটাই মরে গেছে?
কারো জন্ম তারিখ এলে এটাতে এত সুখী হয়ে উৎসব পালনের কী হলো? আল্লাহ আমাদের হায়াত দিয়েছেন, এতে শুকরিয়া আদায় করবো৷ আল্লাহর বিধানের বাইরে গিয়ে উনার নাফরমানী করবো কেনো?
অনেক পিতা-মাতা নিজের সন্তানের জন্মদিন পালন না করলেও অন্যের বাচ্চার জন্মদিনের দাওয়াত এটেন্ড করে। ‘দাওয়াতে নিয়ে না গেলে সন্তান মন খারাপ করবে’, ‘সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে একটু ছাড় দিতে হয়’ - এই অজুহাতে পিতা-মাতা আল্লাহর বিধানের তোয়াক্কা না করে সমাজের রীতি-নীতিকে বেশি মূল্য দিচ্ছে?
সন্তান এবং সম্পদকে আল্লাহ কুরআনে “ফিতনা” বলেছেন।
টাকা-পয়সা, সন্তান-সন্ততি আমাদের জন্য পরীক্ষা, সন্তানকে খুশি করার জন্য আল্লাহর দেয়া বিধানকে অমান্য করছি, এর ফল কি আখিরাতে আমাদের ভোগ করতে হবে না?
অথচ একবারও কি চিন্তা করছি, এই সন্তান আখিরাতে আমার পক্ষে কথা বলবে নাকি বিপক্ষে কথা বলবে?
যে কোনো নিয়ামত আমাদের জন্য পরীক্ষা হতে পারে, আমি কি শুকরিয়া আদায় করছি? নাকি আরো দুনিয়ার জৌলুশে মজে যাচ্ছি?
যে কোন মানুষ আমাদের জন্য পরীক্ষা হতে পারে। আমি কি সমাজকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজের নফসের গোলামী করছি?
আমাদের অন্তরটাকে আল্লাহর দিকে দৃঢ়ভাবে ধাবিত করতে হবে। যত বেশি আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক দৃঢ় থাকবে, সমাজের অ-ইসলামিক রীতি-নীতি পালনে নিজের নফসকে কন্ট্রোল করা সহজ হবে।
নোট:
শুধু জন্মদিন নয় কোন ম্যারিজ ডে, মৃত্যুদিবস ইত্যাদি যা-ই হোক না কেন, কোন দিবস-ই পালন করা ইসলামে জায়েজ নয়।
প্রথম কারণ: বিজাতির অনুকরণ
এই ধরনের যত প্রকার দিবস রয়েছে সেগুলোর কোনোটাই মুসলিমদের সংস্কৃতি নয়।
যদি এগুলো মুসলিমদের সংস্কৃতি হত, তবে এগুলো সাহাবাদের যুগ থেকেই পালিত হয়ে আসতো। তাই যেহেতু এগুলো মুসলিমদের সংস্কৃতি নয় তাহলে বুঝাই যাচ্ছে যে এগুলো কাফের-মুশরিক বিজাতীয়দের সংস্কৃতি থেকে এসেছে।
আর এ প্রসঙ্গে রাসূল ﷺ বলেছেন,
“যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সে ব্যক্তি সেই জাতিরই একজন বলে গণ্য হবে”
(আবূ দাঊদ হা/৪০৩১) ।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুশরিকদের দেশে বাড়ী তৈরি করল তাদের উৎসব দিবস পালন করল এবং এ অবস্থায় মারা গেল তবে তার হাশর তাদের সাথেই হবে। (সূনানে বাইহাকীঃ ২৩৪)
নবী মুহাম্মাদ (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি বিজাতির তরীকা অনুযায়ী আমল করে, সে আমাদের কেউ নয়।”(ত্বাবারানী, সিলসিলাহ সহীহাহ ২১৯৪নং)
“আমাদের তরীকা ওদের (মুশরিকদের) তরীকা থেকে ভিন্ন।”(বাইহাকী ৫/১২৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ২১৯৪)
সাওবান (রা) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু (সা) বলেছেন, “আমি সবচেয়ে যাদের বেশী ভয় করি তারা হচ্ছে নেতা ও এক শ্রেনীর আলেম সমাজ। অচিরেই আমার উম্মতের কিছু লোক মূর্তিপূজা করবে। আর অতি শীঘ্রই আমার উম্মতের কিছু লোক বিজাতিদের সাথে মিশে যাবে।” [ইবনে মাজাহঃ ৩৯৫২। হাদ সহি]
আবূ সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। নাবী (স) বলেছেন, “অবশ্য অবশ্যই তোমরা তোমাদের আগের লোকদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি গুইসাপের গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল (স)! এরা কি ইয়াহুদী ও নাসারা? তিনি (স) বললেন, আর কারা?” –[সহীহুল বুখারী ৭৩২]
দ্বিতীয় কারনঃ মুসলিমদের জন্য দিবস শুধু ২ টি
ইসলামে দুটি দিবস ব্যতীত অন্য তৃতীয় কোন দিবস পালন করা তো এমনিতেই নিষেধ।
আনাস (রা) বলেন, “রাসুল (সা) মদীনায় আগমন করে দেখলেন যে, মদীনাবাসীরা দুটি ঈদ (আনন্দের দিন) পালন করছে ৷ তা দেখে রাসূল (সা) বললেন, জাহীলিয়াতের যুগে তোমাদের দুটি দিন ছিল যাতে তোমরা খেলাধুলা, আনন্দ-ফুর্তি করতে এখন ঐ দিনগুলির পরিবর্তে আল্লাহ তোমাদেরকে দুটি উত্তম দিন প্রদান করেছেন, ঈদুল ফিৎর ও ঈদুল আযহার দিন। (আবূ দাউদ: ১০০৪, নাসাই: ১৫৫৫ হাদীস সহীহ)
এই হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা) বলেছেন ঐ দুটি দিনের পরিবর্তে আল্লাহ্ তোমাদেরকে বাৎসরিকভাবে উদযাপনের জন্য দুটি উত্তম দিন অর্থাৎ দুই ঈদ প্রদান করেছেন। যেহেতু আল্লাহর রাসুল (সা) অন্য মানব রচিত দিবসগুলো পরিবর্তন করে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে দুটি উত্তম দিন প্রদান করেছেন তাই অন্য যে কোন দিবস পালন করা এমনিতেই বাতিল হয়ে যায়।
তাই কোনো মুসলিমের জন্য অন্য কোন প্রকার দিবস পালন করা বৈধ নয়, হোক সেটা জন্মদিন, শোক দিবস, মাতৃভাষা দিবস, বিজয় দিবস, নববর্ষ ইত্যাদি যা-ই হোক না কেন, তা পালন করা যাবে না।
(ঈষৎ পরিমার্জিত)