নাজমুল সাহেব খুব সাধারণ সরকারী ছাপোষা কর্মচারী।তিন মেয়ে এক ছেলে নিয়ে টানাটানির সংসার ছিল এক সময়। একেতো সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন তার উপর তিন তিনটা মেয়ে এই নিয়ে নাজমুল সাহেবের স্ত্রীর সাথে প্রায় খিটিমিটি লেগেই থাকতো।
নাজমুল সাহেবের বড় মেয়ে সোহানা। দেখতে খুবই সুন্দরী। কিন্তু বিয়েকে বিয়ে দেয়ার পরিবর্তে তিনি এইচএসসি পাস করার পরই মেয়েটাকে চাকরীতে ঢুকিয়ে দিলেন। সোহানা চাকরিতে ঢোকার পর সংসারের কিছুটা আয় উন্নতি হতে শুরু করলো।
সোহানার দুই বছরের ছোট যে বোনটা তার নাম রেহানা। রেহানা সোহানার মত অত সুন্দরী না হলেও ঘরের কাজ, রান্না, সেলাইয়ে অসম্ভব গুণবতী কিন্তু ছোটবেলায় টাইফয়েড হওয়ায় পড়াশুনায় সেই যে একবার একটু পিছিয়ে গেল তারপর আর পড়াশুনাই হলো না।আসলে পড়াশুনা হলো না বললে একটু ভুল হবে। কথাটা হবে তাকে আর পড়াশুনা করানো হলো না।নাজমুল সাহেবের যুক্তি যে মেয়েছেলের মাথা ভালো না তার পড়াশোনার পেছনে এত পয়সা খরচ করা মনে অহেতুক টাকা অপচয় করা।
ছোট মেয়ে সেলিনা যেমন দেখতেও সুন্দরী তেমনি মাথাও ভালো ছিল। এক চান্সে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করে চাকরিতে ঢুকে গেল।
ওহ, নাজমুল সাহেবের একমাত্র ছেলের কথাইতো বলা হলো না। আরমান। তিন মেয়ের একমাত্র ছেলে। বাবা, মা আর বোনেদের খুব আদরের…কিন্তু অতি আদরে যা হয় আরকি।যেখানে সংসারের হল ধরবার কথা একমাত্র ছেলের সেখানে সংসারের হাল ধরতে হল নাজমুল সাহেবের মেয়েদের।ছেলেটি অতি আদরে না করলো ঠিকমত পড়াশুনা, না পেলে ভালো চাকরি। বাবা আর বোনেরাই যেহেতু উপার্জন করে, বাজার করে সব সামলে নেয় তাই তার না আছে সংসারের হাল ধরার ইচ্ছা, না আছে যোগ্যতা..
একসময়, নাজমুল সাহেবের ছোট মেয়ের যে ছিল একই সাথে সুন্দরী এবং মেধাবী। সে তার পছন্দের কলিগগে বিয়ে করে দেশের বাইরে চলে গেল। সবাই ভেবেছিল, এই সুযোগে যদি সোহানা এবং রেহানার বিয়েটা হয়ে যায়। কিন্তু কিসের কি, দুই মেয়ে বিয়ে না দিয়ে নাজমুল সাহেব এবং মাকসুদা বেগম তাদের একমাত্র ছেলে আরমান বিয়ে দিয়ে দিলেন।
এভাবেই ৮৫ বছর বয়সী নাজমুল সাহেব এখন আর রাত দিনের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। চিনতে পারেন না কোনটা ছেলে আর কোনটা মেয়ে। এমনকি বিছানায় শুয়ে থেকে খাবার আর বর্জ্যের মাঝেও উনি তফাৎ খুঁজে পান না এখন আর…৫০ ঊর্ধ্ব মেয়ে দুটো এখনো ক্লান্তি আর আশাহীন এক ঠকে যাওয়া জীবন নিয়ে ঘরে বাইরে কাজ করছে, নাজমুল সাহেবের সেবা করে যাচ্ছে তবে যে চোখগুলোয় থাকার কথা ছিল মায়া আর ভালবাসা সেখানে আছে শুধু বঞ্চিত হওয়ার ঘৃণা আর কষ্ট।
নাজমুল সাহেবের জীবনের গল্প কেবল একটি পরিবারের কাহিনি নয়—এটি আমাদের সমাজের একটি বড় বাস্তবতার আয়না। ইসলামি সমাজে একজন অভিভাবকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো তার সন্তানদের সঠিক পথে লালন-পালন করা, ন্যায়বিচার করা, আর মেয়েদের নিরাপদ ও সঠিক সময়ে বিয়ে দেওয়া। কিন্তু নাজমুল সাহেব সেই মৌলিক দায়িত্বে ব্যর্থ হয়েছেন।তিনি ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার পরিবর্তে মেয়েদের উপার্জনের উপর ভরসা করেছেন, আর্থিক দায় তাদের কাঁধে চাপিয়েছেন—যা ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়। কুরআন স্পষ্ট বলছে:
“তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে দিয়ে দাও… যদি তারা দরিদ্র হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সমৃদ্ধ করবেন।“
(সূরা আন-নূর ৩২)
অতএব, অভিভাবকের জন্য মেয়ের বিয়ে আটকে রাখা শুধু ব্যক্তিগত ভুল নয়, বরং একটি সামাজিক অপরাধ ও ধর্মীয় গুনাহ। এটি মেয়েদের প্রাকৃতিক ও বৈধ জীবনযাত্রার অধিকার কেড়ে নেওয়া। অবশ্যই তাকে এই দায়িত্বে অবহেলা করার জন্য তাকে জবাব্দিহি করা হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক, এবং তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (বুখারি, মুসলিম)
এমন দায়িত্বহীন ও কর্তব্যহীন অভিভাবকের জন্যই অনেক ছেলে-মেয়ে শেষমেশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই ঠিক করতে বাধ্য হয়, যেমনটি করেছিল এই গল্পের ছোট মেয়েটি। অভিভাবকের অবহেলা, অন্যায় সিদ্ধান্ত ও অযথা বিয়ে না দেয়ার কারণে তারা অভিভাবকের অমতে গিয়ে একা বিয়ে করে ফেলে—যা ইসলামের দৃষ্টিতে ঘৃণিত কাজ এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বড় কারণ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:“অভিভাবক ছাড়া কোনো নারীর বিয়ে বৈধ নয়।” (আবু দাউদ, ২০৮৫)
সবসময় যে অভিভাবকের অবহেলার কারণেই এমনটি ঘটে তা নয়, তবে এটাও একটা বড় কারণ। মেয়ে স্বাবলম্বী হয়ে আয় করে বাবা-মায়ের সংসার চালাবে এমনকিছু মেয়ের উপর চাপিয়ে দেওয়া বাবা-মায়ের জন্য বৈধ নয়। যদি না মেয়ে স্বেচ্ছায় তা করে। আর এজন্য মেয়েকে বিয়ে না দেওয়া অবশ্যই হারাম। এটা একটা মারাত্মক জুলুম। রিজিকের মালিক আল্লাহ; তাই অভিভাবকের উচিত মেয়েকে আর্থিক শোষণ না করে, উপযুক্ত সময়ে দ্বীনদার ও চরিত্রবান পুরুষের সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া। এতে মেয়ের মর্যাদা রক্ষা পাবে, পরিবার ও সমাজও সুস্থ পথে থাকবে।
(সংযোজিত ও পরিমার্জিত)