পর্ব-১

জাতি হিসেবে আমরা কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পার হচ্ছি। গাজায় বাচ্চারা অভুক্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। ত্রাণ ঢুকতে দেয়া তো হচ্ছেই না, যা-ও সামান্য ঢুকছে, সেখানেও টার্গেট করে বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। খাবার নিতে গিয়ে মারা পড়তে হবে জেনেও মানুষ ছুটে গিয়ে ত্রাণের লাইনে দাঁড়াচ্ছে। যেন তার অনাহারে কাঁদতে থাকা বাচ্চাদের মুখে এক লোকমা খাবার তুলে দিতে পারে। মায়েরা এত অসহায় হয়ে পড়েছে যে ভাবছে তার সন্তান এভাবে ক্ষুধার কষ্টে তিলে তিলে হাড্ডিসার হয়ে মারা যাওয়ার চাইতে বোমার আঘাতে মারা গেলেও হয়ত বেঁচে যেত। বয়স্ক লোকেরা লাইনে মানুষের পায়ে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছে।

আসলে গাজার শোচনীয় অবস্থার বিবরণ দেয়ার মতো ভাষা আমার জানা নেই। সুস্থ-সবল বাচ্চাদেরকে চোখের সামনে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, কঙ্কালসার হয়ে মারা যেতে দেখার চাইতে কঠিন কোনো পরীক্ষা এ দুনিয়াতে থাকতে পারে না। সামান্য ময়লা পানি খেয়েও গাজার শিশুর হাসি দেখে মনে হবে সে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। এক টুকরো রুটি তাদের জন্য এত দামি যে সারা পৃথিবীর মানুষ জড়ো হয়েও তাদের হাতে এক টুকরো রুটি পৌঁছাতে পারছে না।

আমরা আমাদের বাচ্চাদের সামান্য জ্বর, সর্দি, কাশি হলেও অস্থির হয়ে পড়ি। একবেলা কম খেতে দেখলে চিন্তা শুরু করি। মায়েদের কমন ডায়লগ, বাচ্চাটা কিছু খেতেই চায় না। অথচ দেখা যায় বাচ্চাগুলো আমাদের সুস্থ-সবলই আছে, হেসেখেলে বেড়াচ্ছে। আমি চিন্তা করতে পারিনা, একটা ছোট্ট শিশু না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে! কতটুকুই বা সে খেত? এক মুঠো খাবারে তার সারাবেলা চলে যাবে। এই একটা মুঠো খাবার তাকে আমরা দিতে পারছি না? আল্লাহ আমাদের উপর রহম করো! না জানি এই শিশুর জন্য আমরা কিয়ামতে আটকা পড়ে যাই! না জানি এই শিশুর মায়ের অশ্রুর কাছে আমরা বাধা পড়ে যাই। না জানি খাবারের যোগাড় করতে না পারা বাবার দীর্ঘশ্বাসের সামনে আমরা ধরাশায়ী হয়ে যাই।

গাজায় যে জেনোসাইড চলছে, আমাদের কি কোনো দায় নেই? আমাদের কি করণীয় কিছুই নেই? আমরা কি এত সহজেই আল্লাহর জবাবদিহিতা থেকে পার পেয়ে যাব?

ইজ/ রায়ে/ ল যে জুলুম চালাচ্ছে, তার সাক্ষী হচ্ছে পুরো পৃথিবী। আরব নেতারা না দেখার ভান ধরে চুপ করে আছে। বিশ্বের সবচেয়ে সভ্য সবচেয়ে উন্নত দেশগুলো ইজ/ রায়ে/ লকে ক্রমাগত ব্যাক-আপ দিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা যারা সাধারণ মানুষ, আমরা আছি নিজেদের ভোগবিলাস আর এন্টারটেনমেন্টে বুঁদ হয়ে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা গাজায় যে পরীক্ষা দিয়েছেন, তা শুধু গাজাবাসীর জন্যই নয়, আমাদের জন্যেও পরীক্ষা। আমরা গাজার ভাইবোনদের জন্য কী করছি? কতটুকু করছি?

আমরা যতদিন ভাবব, আমাদের করার কিছুই নেই, ততদিন গাজাবাসীর প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা অনুভব করব না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“মুমিনদের একে অপরের প্রতি সম্প্রীতি, দয়া ও মায়া-মমতার উদাহরণ (একটি) দেহের মত। যখন দেহের কোন অঙ্গ পীড়িত হয়, তখন তার জন্য সারা দেহ অনিদ্রা যও জ্বরে আক্রান্ত হয়।” [বুখারি, মুসলিম]

আমরা কি আমাদের গাজার ভাইবোনদের কথা ভেবে সত্যি অস্থির হই? জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মতো অসুস্থ বোধ করি? গাজার শিশুদের দুশ্চিন্তায়, কষ্টে ছটফট করি? অশান্ত হৃদয়ে ঘুমাতে পারি না? তাদের ছবি, নিউজ আর ভিডিওগুলো দেখার পর ঠিক কেমন হয় আমাদের প্রতিক্রিয়া? আর কেমনই বা হওয়া উচিত আমাদের প্রতিক্রিয়া, আমাদের কার্যক্রম? পরবর্তী পর্বগুলোতে আমরা আমাদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

পর্ব - ২
গাজার উপর চলছে সবচাইতে নিকৃষ্ট পর্যায়ের হত্যাযজ্ঞ, আর আমরা সে গণহত্যার সাক্ষী হয়ে চলেছি প্রতিনিয়ত। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন দেখবে, সারা পৃথিবীর চুপ করে এই হত্যাযজ্ঞ দেখেছে, কী জবাব দেব আমরা তাদের? কোন মুখে তাদেরকে দয়া আর মনুষ্যত্বের কথা বলব? নিজেরা নির্লিপ্ত থেকে কীভাবে তাদেরকে মহৎ হতে শেখাব?
আজকের পর্বে আমরা আলোচনা করব আমাদের করণীয় সম্পর্কে। গাজার জন্য, ফিলিস্তিনের জন্য এবং আক্বসা মসজিদের জন্য আমাদের দায়িত্বগুলো বোঝার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
১। মানসিকতার পরিবর্তনঃ
আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই মনে করে যে গাজার এই মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে আমাদের “দুয়া” করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। অথবা অনেকে বলে, একা একা আমি কী আর করতে পারব?
এই ধরনের নেতিবাচক চিন্তা আমাদেরকে যেকোনো ব্যাপারে উদাসিন করে তোলে। নিজেকে অসহায় ভেবে নিয়ে, মনের অজান্তেই আমরা তখন নিজেদের কাঁধ থেকে দায়িত্ব ঝেরে ফেলি। কাজেই আমাদের প্রথম কাজ হলো, এই দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন। এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে, দুয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। অবশ্যই দুয়া মুমিনের হাতিয়ার। কিন্তু যখন কেউ এভাবে বারবার বলতে থাকে, দুয়া ছাড়া কিছুই করার নেই, তখন সে আসলে দুয়াও ঠিকমতো করে না। বরং হাত গুটিয়ে বসে পড়ে। চিন্তা করে দেখুন, দুনিয়াতে যেসব কাজে আমরা সিরিয়াস, সে কাজউলোর জন্য আমরা কখনোই শুধু দুয়া করে ক্ষান্ত হই না, বরং যেকোনো পন্থায়, যেকোনো উপায়ে কাজটা করার চেষ্টা করি। নানাজনের সাথে আলাপ করি, নানা জনের কাছে সাহায্যের অনুরোধ করি। একই ভাবে, গাজার জন্যেও আমাদেরকে “বাস্তবে” কিছু করতে হবে। দায়সারা ভাবে কেবল “দুয়া ছাড়া কিছু করার নেই” কিংবা “আমার একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব না” এসব চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
আল্লাহ তা’আলা চাইলে অনেক ছোট কোনো কাজের ভেতরেও অনেক বারাকাহ দিতে পারেন। ছোট্ট কোনো পদক্ষেপ থেকেও বিরাট বিপ্লব হয়ে যেতে পারে। তাই কোনো কাজকেই ছোট করে দেখা যাবে না। একক চেষ্টায় করা কোনো পদক্ষেপকেও সামান্য ভাবার কারণ নেই।
২। আপডেট রাখাঃ
গাজা ও ফিলিস্তিনের নিউজ সম্পর্কে আমাদেরকে আপডেটেড থাকতে হবে। নিউজ নেয়ার ক্ষেত্রে অথেনটিক সোর্স ব্যবহার করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ফেসবুক, টুইটার ও ইন্সটাগ্রামে এমন অনেক একাউন্ট আছে, যেখান থেকে গাজার ব্যাপারে নিয়মিত আপডেট দেয়া হয়। এসব একাউন্ট ফলো দিয়ে রাখা উচিত। নিয়মিত গাজার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও-ও দেখা দরকার। আমরা ভাবতে পারি, এসব আমাদের অন্তরকে দুর্বল করে দেয়। আমরা এই মর্মান্তিক দৃশ্য সহ্য করতে পারি না। আমাদের অসুস্থ লাগে।
অসুস্থ বোধ করলে আমরা অতিরিক্ত গ্রাফিক ছবি ও ভিডিপগুলো এড়িয়ে সাধারণ ভিডিও ও ছবিগুলো দেখতে পারি। নিউজ পোর্টাল থেকে আপডেট পড়তে পারি। সমসাময়িক বিভিন্ন পডকাস্ট ও লেকচার থেকে গাজা বিষয়ক আলোচনা শুনতে পারি।
মোট কথা, গাজার ব্যাপারে নিয়মিত অবগত থাকা দরকার। আমরা যে জিনিসগুলোর সাথে জড়িত থাকি, সেগুলোই আমাদের মন ও মননে প্রভাব ফেলে। যে ব্যক্তি সারাদিন ড্রামা আর মুভি দেখে, সে সেসব নায়ক-নায়িকাদের নিয়েই চিন্তা করে। তাদেরকে এক নজর দেখার স্বপ্নে বিভোর হয়। যে খেলাধুলো পছন্দ করে, সে ব্যক্তিজীবনেও খেলোয়াড়দের গল্পই করে। আপনি যদি গাজা সম্পর্কে কিছুই না জানেন, তাহলে কখনোই মন থেকে তাদের জন্য মায়া অনুভব করবেন না। তাদের কষ্ট আপনাকে স্পর্শ করবে না। একজন মুসলিম হিসেবে গাজার ভাইবোনদের ব্যাপারে জানা, তাদের উপর ইজ/ রায়ে/ ল এবং পৃথিবীর পরাশপ্তিগুলো কীভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে, সে বিষয়ে জ্ঞান রাখা অতীব জরুরি।
৩। বয়কট মুভমেন্টঃ
গাজার উপর চলা জেনোসাইডের বিরোধিতা করার জন্য একটা উত্তম পদক্ষেপ– বয়কট মুভমেন্ট। আমরা দেখেছি কীভাবে বয়কট করার মাধ্যমে কোকা কোলা, কে এফ সি, স্টারবাকস এসব কম্পানি মারাত্মক প্রভাবিত হয়েছে। কাজেই বয়কটকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সারাবিশ্বে মিলিয়ন মিলিয়ন মুসলিমের বসবাস। তারা প্রতিদিন লাখো কোটি দামের পণ্য কিনছে। আমরা যদি সবাই মিলে ইজ/রায়ে/লকে সমর্থন দেয়া ব্যবসাগুলো বয়কট শুরু করি, তাহলে এসব ব্যবসায়ীরা বড় রকমের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ক্রেতাদের খুশি রাখতে কেউ কেউ হয়তো তাদের ইজ/রায়ে/ল সমর্থন থেকে সরে দাঁড়াবে। বয়কটের মাধ্যমে ভোক্তা ব্যবসায়ীদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এরপরেও প্রশ্ন আসতে পারে, সবাই তো বয়কট করছে না, আমি একা করে কী লাভ হবে?
যদি আমরা ধরেও নিই, সবাই বয়কট করবে না, এরপরেও একজন মুসলিম হিসেবে, একজন বিবেকসম্পন্ন দরদী মানুষ হিসেবে বয়কট করা উচিত। আমরা যখন দেখি, গাজায় ক্ষুধার্ত শিশুগুলোর উপরেও গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে, হাসপাতালে আহত মানুষগুলোকে অ্যানেস্থেটিকস ছাড়াই সার্জারি করতে হচ্ছে, কেননা কোনো মেডিসিন ও এইড ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না, ডাক্তারদেরকে টার্গেট করে বোমা মারা হচ্ছে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে পর্যন্ত মানুষগুলো নিরাপদে নেই, তখন ইজ/রায়ে/ল সমর্থিক ব্র্যান্ডগুলো থেকে কেনার রুচি এমনিতেই থাকার কথা না। আমরা যেন নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধা ও পছন্দনীয় প্রডাক্ট কেনার কথা ভেবে বয়কট করা বন্ধ না করি। বরং প্রত্যেকে নিজেদের স্থান থেকে যতবেশি সম্ভব ইজ/রায়ে/ল সমর্থিত ব্র্যান্ড ও পণ্য বয়কট করতে হবে।
হতে পারে, বয়কটের কারণে আমাদের সাময়িক কিছু অসুবিধা হচ্ছে। একটা মানসম্পন্ন প্রডাক্টের বদলে আরেকটা প্রডাক্ট খুঁজে বের করতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু গাজার এতিম, সারাজীবনের জন্য হাত-পা পঙ্গু হয়ে যাওয়া শিশুদের কষ্টের সামনে আমাদের এই সাময়িক অসুবিধার কোনো তুলনাই হয় না। তাই নিজেদের এই ছোট্ট অবদানকে বিশাল কাজ মনে করার কিছু নেই। বরং আমাদের ভাইবোনদের কষ্টের প্রতিবাদে অন্তত এই সামান্য কাজটুকু আমাদের সবারই করতে পারা উচিত।
(চলবে)