বর্তমান সময়ে জ্ঞান অর্জনের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইউটিউব ও ফেসবুক। দ্বীনি জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রেও এই দুটি মাধ্যমই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষ এখন যে যার পছন্দের বক্তা বা লেখককে অনুসরণ করছে।তারাই হয়ে উঠেছে, অনুসারীদের জ্ঞানার্জনের মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এসব সেলেব্রিটি বক্তা বা লেখকের অনেকেরই দ্বীনি ট্র্যাডিশনাল পড়াশোনার অভিজ্ঞতা নেই- তারা স্বীকৃত দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে বসে কুরআন, হাদিস, ফিকহ, উসূল ও আকীদা শিখেননি। তবু মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। কারণ তাদের আছে দুনিয়াবি অগাত জ্ঞান, বড় বড় ডিগ্রি, ও সুন্দর- সাবলীল ভাষায় নিজ দর্শনকে উপস্থাপনের দক্ষতা।
অনেক সময় তারা ইসলামের বিভিন্ন বিধান নিয়ে অভিনব ব্যাখ্যা দাঁড় করান, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসা আলিমদের ব্যাখ্যার সাথে একেবারেই মেলে না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা কুরআন ও সুন্নাহর সাথেও সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়। কিন্তু তাদের অনুসারীরা বিষয়টি বুঝতে পারে না; আর বুঝলেও মানতে চায় না। কারণ, তাদের চোখে এসব ব্যাখ্যাই বেশি আধুনিক, বেশি যুগোপযোগী ও বেশি যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। এভাবেই এসব ব্যক্তি ধীরে ধীরে অন্যদের কাছে অনুকরণীয় রোল মডেলে পরিণত হয়।
অথচ ইসলাম এমন এক ধর্ম, যা তার বিশুদ্ধতা রক্ষার ব্যাপারে খুবই সংবেদনশীল। ঈমান হোক বা আমল- কোনো ক্ষেত্রেই মানুষের বানানো নতুনত্বের জন্য এখানে জায়গা নেই। দ্বীনের মূল কাঠামো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ আগেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেখানে নিজের ইচ্ছামতো কিছু যোগ বা বিয়োগ করার অধিকার কারও নেই। আমলের ক্ষেত্রে যেমন নতুন কিছু যুক্ত করাকে বিদ‘আত বলা হয়, ঠিক তেমনিভাবে ইসলামের প্রতিষ্ঠিত বিধানকে নতুন ব্যাখ্যাও পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায়।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এসব সেলেব্রিটি বক্তা বা লেখক একটি বড় কমিউনিটির কাছে হয়ে উঠেছেন কষ্টিপাথর- আদর্শের মানদণ্ড। অথচ তাদের কেউ কেউ ওয়াহির সার্বজনীন বিধানে বিবৃত নারীর পর্দাকে শিথিল করতে চান, ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করতে চান, এবং ঘরের বাইরের কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে পার্লামেন্ট পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি নারীকে দেখতে চান! অথচ, হাদিস থেকে আমরা জানি, নারীদের জন্য ঘরই সর্বোত্তম। এমনকি মসজিদে গমন করে জামাতে সালাত আদায় করার চেয়েও ঘরেই সালাত আদায় করা উত্তম। এই মর্মে একাধিক হাদিস আছে। একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, উম্মে হামিদ (রাঃ) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সাথে সালাত আদায় করতে ভালোবাসি।” তিনি ﷺ বললেন- “আমি জানি তুমি আমার সাথে সালাত আদায় করতে ভালোবাসো। কিন্তু তোমার ঘরের ভেতরে সালাত আদায় করা তোমার উঠানে সালাতের চেয়ে উত্তম, উঠানে সালাত আদায় করা তোমার মহল্লার মসজিদের চেয়ে উত্তম, আর মহল্লার মসজিদে সালাত আদায় করা আমার মসজিদে সালাত আদায়ের চেয়েও উত্তম।” (সুনান আবু দাউদ)
আর এভাবেই ইজতিহাদের নামে ওহির ওপর সেই কথিত সেলেব্রিটিরা নিজের বিচার বুদ্ধিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, ধর্মের ভেতরে বিপজ্জনক চিন্তার প্রবেশ ঘটাচ্ছেন এবং নিজেরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং অন্যদের বিভ্রান্ত করছেন।
এ কারণেই দ্বীনের জ্ঞান কার কাছ থেকে নেওয়া হবে- এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন। তারা ইলম গ্রহণের আগে মানুষের চরিত্র, আকীদা, মানহাজ এবং তিনি কার কাছ থেকে শিখেছেন- এসব বিষয় যাচাই করতেন। বিজ্ঞ তাবেঈ ইবনে সিরিন (রহ.) এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেন, “এই ইলমই হচ্ছে দ্বীন। তাই তোমরা দেখো- তোমরা কার কাছ থেকে তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করছ।” ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলতেন, “যে ব্যক্তি কুরআন ও হাদিস ছাড়া অন্য কিছুর ওপর দ্বীন দাঁড় করায়, সে বিভ্রান্ত।”
প্রিয় বোনেরা, দ্বীনের জ্ঞান কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ, জনপ্রিয়তা বা সুন্দর উপস্থাপনার বিষয় নয়। দুনিয়াবি বড় ডিগ্রি, সাবলীল ভাষা বা হাজারো ফলোয়ার কাউকে দ্বীনের ব্যাখ্যায় কর্তৃত্বশীল করে তোলে না। তাই সতর্ক হোন এবং সঠিক পদ্ধতিতে ইলম অর্জনের চেষ্টা করুন। আর যদি কারও লেখা বা কথা আপনার ভালো লাগে, তবে তাকে কষ্টিপাথর বানাবেন না; বরং তাকে ও তার কথাকে যাচাই করে দেখুন। যদি তা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালিহিনের মতের অনুগামী হয়, গ্রহণ করুন; আর যদি না হয়, তবে প্রত্যাখ্যান করুন। যে মানুষটি ইসলামি বিষয়ে কুরআন–সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক নিজের মনগড়া মতামত ছড়ায়, তাকে প্রত্যাখ্যান করুন। নতুবা তার ভুল চিন্তার দ্বারা আপনি নিজের অজান্তেই প্রভাবিত হয়ে যেতে পারেন।