আমাদের আশেপাশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বিশেষ করে, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারী সমাজের বেশ বড় একাংশ ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত একটা চিন্তাধারা পোষণ করে। “নারীবাদ দর্শন তাদের অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসার বিশ্বাসযোগ্য পথপ্রদর্শক!” তারা বিশ্বাস করে, এই মতবাদের দর্পনে দেখানো অধিকার আদায়ের স্ট্র্যাটেজি বাস্তবসম্মত। তাদের কথাবার্তা, আচরণে নারীবাদীতার একটা স্পষ্ট ছোঁয়া দেখা যায়। অনেকে হয়তো টক্সিক ফেমিনিজমকে সাপোর্ট করে না। তবে খুব একটা বিরোধিতা করে, এমনটাও দেখা যায় না। তাদের স্থিরবিশ্বাস, তাদের সব সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা থেকে উত্তরণের পথ কেবল নারীবাদ তত্ত্বই বাতলে দিতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা এতো সরলরৈখিক না। ফেমিনিজম নিয়ে অল্প-বিস্তর পড়াশোনা করলেই, এসব মতবাদের ইন্টার্নাল নানা ক্রাইসিস সামনে আসবে। বহু ঐতিহাসিক ঘটনা আপনাকে এটা স্পষ্ট করে দিবে যে, আপনার সমস্যা মূলধারার নারীবাদকে মোটেও প্রভাবিত করে না।
.
নারীবাদীদের মধ্যে খুব কমন একটা প্র্যাক্টিস দেখা যায়। তারা নিজেদের গ্রাউন্ডের বাহিরের সবাইকেই প্রচন্ডভাবে হিউমিলিয়েট করে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী নারীর যেই প্রকৃত সংজ্ঞা, তা নিয়ে মাঝে-মাঝে কনফিউজড হয়ে যেতে হয়। ট্রান্সজেন্ডারবাদ এবং নারীবাদদের বেশ পুরো একটা ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই “ট্র্যান্সওম্যান আর রিয়েল ওম্যান” স্লোগানটি তাদের কাছে বেশ সাহসী(!) বক্তব্য হিসেকে গৃহীত হয়। তাদের কাছে কোনো হিজাব পরিহিতা নারীর নিপীড়নের গল্প আপনি শুনবেন না। শুনবেন না নিক্বাবের কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছে নারী হেনস্তার প্রতিবাদে কোনো স্লোগান।
বরং তাদের ঝুলিতে পাওয়া যাবে, কোনো বিশ্বাসযোগ্য সোর্স ছাড়া ইসলামিক সিম্বল সম্বলিত কোন ব্যক্তি দ্বারা নারী হেনস্তার বহু ঘটনা। অবশ্যই সেগুলোও কনসার্নিং, সেসবের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু তাদের সেন্সর শুধুমাত্র তাদের ঘরানার নারীদের বেলাতেই এক্টিভ হয়। ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং!
তাদের অ্যাক্টিভিজম স্ট্র্যাকচারে কখনও নারীমহলের সামগ্রিক অধিকারের প্রতিচ্ছবি ফোটে উঠে না। একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকেন্দ্রীকতা, মূলধারার নারীবাদের বেশ পুরনো সিফাত। হিস্টোরিক্যাল এমন নানা ঘটনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
.
১৯৭০ দশকের শুরুর দিক। পশ্চিমাবিশ্বে তখন নারীবাদের সেকেন্ড ওয়েভের জোরালো অ্যাক্টিভিজম চলছে। বেটি ফ্রিডান, গ্লোরিয়া স্টেইনমের মতো প্রভাবশালী শ্বেতাঙ্গ নারীবাদীদের নেতৃত্বে পশ্চিমা নারী মহল মোহগ্রস্ত অবস্থায়। সেই সময়ের মূল লক্ষ্য ছিলো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীদের জন্য পুরুষের মতো কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতা এবং সমান বেতন ও পদাধিকার নিশ্চিত করা।
আপাতদৃষ্টিতে এই দাবি নারীবান্ধব মনে হলেও, এটি তাদের চিরচেনা ফিতরাত অনুযায়ী সমাজের বেশিরভাগ নারীদের স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারেনি। বরং এটিও একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন হয়ে দাঁড়ায়।
.
১৯৭৩ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে, ‘ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর ওম্যান’ (NOW)-একটি কনফারেন্স চলছিল। মঞ্চে থাকা শ্বেতাঙ্গ নারীবাদী নেত্রীরা বক্তব্য শুরু করে, যার মূল কথাগুলো ছিলো অনেকটা এমন, “আমাদের মধ্যবিত্ত নারীদের দমিয়ে রাখা হয়েছে। পরিবারগুলো আমাদের কাছে কারাগারের মতো। আমাদের স্বামীরা অফিসে যায়, আর আমাদের ডিগ্রিগুলোতে ধূলোর আস্তর জমে। আমাদের মুক্তি হলো ‘পুরুষের সমানাধিকার’, আমাদের প্রয়োজন হলো সমান বেতন এবং পেশাদার জগতে প্রবেশের অধিকার!”
.
কিন্তু এই এজেন্ডা সমাজে থাকা অন্য নারীদের বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। আলোচনার বিরতিতে কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাক্টিভিস্ট মার্গারেট স্লোন-হান্টার উঠে দাঁড়িয়ে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “আপনারা পুরুষের সমান হতে চান, আপনারা সুবিধা চান। কিন্তু আপনাদের এজেন্ডায় কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনা গৃহপরিচারিকা বা কারখানার শ্রমজীবী নারীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা কোথায়? আপনারা বলছেন পরিবার ভাঙতে। কিন্তু যখন শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে আমাদের পুরুষরা নির্যাতিত হয়, তখন আমাদের পরিবারের চেয়ে নিরাপদ দুর্গ আর কী আছে?”
এমন বহু মতানৈক্যের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, পরবর্তীতে কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীরা মূলধারার নারীবাদ থেকে সরে আসে। ১৯৭৩ সালের মে মাসে নিউইয়র্ক সিটিতে, কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের দ্বৈত নিপীড়ন অর্থ্যাৎ জাতিগত বৈষম্য এবং লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে মার্গারেট স্লোন-হান্টার, মিশেল ওয়ালেসের মতো কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল ব্ল্যাক ফেমিনিস্ট অর্গানাইজেশন বা NBFO (National Black Feminist Organization) এর প্রতিষ্ঠা হয়।
.
মূলধারার নারীবাদের বিরূদ্ধে পশ্চিমা সমাজে কয়েক যুগ আগেই এমন বহু অভিযোগ জমা পড়েছে। তাদের ফেলে দেয়া মতাদর্শ আমরা গলায় ঝুলিয়ে নিজেদের মুক্তির অলীক স্বপ্নে বিভোর।
যেই মতবাদ ক্রমাগত বিতর্কিত আর পরিবর্তিত হয়, তা আদৌ নারী মুক্তির সনদ কি করে হতে পারে! যেই মতাদর্শে পুরো নারী সমাজের সামগ্রিক সমস্যার সমাধান নেই তা এমন এক শাশ্বত বিধানকে চ্যালেন্জ করে, যা স্বয়ং পুরো সমাজের স্রষ্টার প্রবর্তিত বিধান।
.
যেকোনো মুহুর্তে, যেকোনো স্থানে, যেকোনো শ্রেণির নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে সম্ভব রবের দেওয়া সেই শ্বাশত বিধান। যা অপর্রিবর্তিত, তবে সময়োপযোগী। ধরুন ঠিক এই মুহুর্তে, সুদানের এক প্রত্যন্ত গ্রামে কোন এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অধিকার আদায়েও ইসলাম তাৎক্ষণিক সমাধান দেয়ার ঐশ্বরিক শক্তি রাখে। কিংবা গা||যযার কোনো বৃদ্ধার অধিকার নিশ্চিত করতে, ইসলাম এমন বিধান প্রনয়ণ করতে পারে যা তথাকথিত মানবাধিকার তত্ত্ব অথবা নারীবাদ দর্শন দ্বারা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব!
.
রবের দেয়া সেই শ্বাশত বিধান অনুযায়ী, শ্রেষ্ঠত্বের বিচার জাতি, শ্রেণি বা লিঙ্গের ভিত্তিতে হয় না। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি “তাক্বওয়া”। ক্বুরআনে ‘সূরা হু’জরাত আয়াত নম্বর ১৩’-তে আল্লাহ তা’য়লা নারী,পুরুষ, জাতি, গোষ্ঠী সবকিছুর উর্ধ্বে সম্মানের এমন এক মাপকাঠি স্থির করে যা সার্বজনীন! আল্লাহ তা’য়লা বলেন, “হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাক্বওয়া সম্পন্ন।“(সূরা হু’জরাত-১৩)
.
গত শতাব্দী থেকে বর্ণবৈষম্য আন্দোলন কিংবা উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে নারী অধিকার আন্দোলনে যেসব দাবি উত্থাপন করে, সেক্যুপাড়া নিজেদের প্রগতিশীল দাবি করে, তার চেয়ে উচ্চস্তরের অধিকার নিশ্চিতের বিধান প্রণীত হয়েছে আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই। এমন বিধান যা সবার জন্য সমান। যেখানে উচু-নিচু, সাদা-কালো, নারী-পুরুষের ব্যবধান নেই। বিদায় হা’জ্জের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) লক্ষাধিক সাহাবির সামনে সেই শাশ্বত মানবতার সবক দিয়ে বলেন, “কোনো অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো কালোর ওপর সাদার শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর কোনো সাদার ওপর কালোর শ্রেষ্ঠত্ব নেই, যদি না তাক্বওয়ার ভিত্তিতে হয়।” (মুসনাদে আহ’মাদ)
.
তথাকথিত নারীবাদ দর্শন আমাদের যে আকাশছোঁয়া মুক্তির প্রতিশ্রুতি শোনায়, তা প্রকৃতপক্ষে একটি অলীক স্বপ্ন মাত্র। এর বিপরীতে, আমাদের কাছে রয়েছে এক অভেদ্য সুরক্ষা, এক পরম পবিত্রতা এবং এক শাশ্বত, সার্বজনীন জীবনব্যবস্থা। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের প্রতিটি স্পন্দন এবং যন্ত্রণার গভীরতা জানেন তাঁর পক্ষ থেকে আসা এই চিরস্থায়ী বিধানকে কি কখনও কোনো বিচক্ষণ ও সত্যনিষ্ঠ মন প্রত্যাখ্যান করতে পারে!