আমি প্রথম চাকরি শুরু করি একটা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাই স্কুলে। তখন পর্দা বলতে মাথায় শাড়ির সাথে ম্যাচ করে জর্জেট টাইপের এক টুকরো কাপড় বেঁধে যতটা সাজগোজ করা যায় আর কি। নতুন চাকরি মানে একটা নতুন আনন্দ। যদিও সেই জবে স্যাটিস্ফায়েড ছিলাম না, বিসিএসের জন্য ওয়েট করছিলাম। ৩৩তম তে নন ক্যাডার আসার পর ৩৪তম এর রিটেন দিয়ে স্কুলে জয়েন করেছিলাম।
যা হোক, সেই আনন্দের মাঝেও জবের একটা জিনিস আমি কোনভাবেই মেনে নিতে পারতাম না। সেটা হলো শহীদ মিনার, ছবি ইত্যাদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ। আমার প্রচন্ড কষ্ট হতো। মনে হতো আমি বড় মাপের গুনাহগার অফ কোর্স কিন্তু শিরক কিভাবে করবো! কিন্তু এটা কোনভাবেই স্কিপ করা সম্ভব হচ্ছিলো না। আরও নতুন বলে আমাকে খুঁজে খুঁজে এগিয়ে দেয়া হতো সামনে। তাই ফাঁকি দেয়া যাচ্ছিলো না।
আরও একটা ব্যাপার খারাপ লাগতো। বিভাগীয় শহরের ক্যান্টনমেন্ট স্কুল হওয়ার প্রচুর প্রোগ্রাম হতো এবং নাচগান হতো। এই প্রোগ্রামগুলোর এবং নাচগানের সাথে যুক্ত থাকতে খারাপ লাগতো। মনে হতো আমি হতো আমি গানবাজনা দেখি সেটা না হয় আমার গুনাহ। আল্লাহ তাআলা মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু এতো এতো মেয়েদের যে নাচ, গান এর তদারকি করছি, তাদের কাছে এগুলো গ্লোরিফাই করছি ওদের মনের ভিতর তো আজীবনের জন্য হারামের প্রতি সফটনেস আর ইনসেনসিটিভিটি তৈরি করে দিচ্ছি এটার কি হবে!
যা হোক, এর মধ্যে ৩৪তম তে রেকমেন্ডেড হলাম আলহামদুলিল্লাহ। ততদিনে ৩৫ তম এর রিটেন সামনে। কলেজর চাকরিতে ফ্যামিলির জন্য কিছু সময় পাবো এটা চিন্তা করে আর রিটেন দিতে ইচ্ছা করেনি। কিন্তু জয়েন করার সময় বাঁধলো বিপত্তি। আমার বড় বাবাটার বয়স তখন দুই মাস। কিন্তু বাচ্চা নিয়ে জয়েন করতে দূরে নতুন এলাকায় একা যে যাবো সাথে যাওয়ার মতো কেউ নাই। কোনভাবেই পাওয়া গেলো না। তখনই করলাম আমার জীবনের অন্যতম জঘন্য কাজটা। দুই মাসের বাচ্চাকে মায়ের কাছে রেখে চলে গেলাম বহু আকাঙ্ক্ষিত চাকরিতে জয়েন করতে। ওর খাওয়া নিয়ে সমস্যা হয়নি। কারণ নরমাল ডেলিভারি হলেও অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কিছু কারণে ব্রেস্টফিড করানো যায়নি। ও শুরু থেকেই ফর্মুলা খেতো। মায়ের কাছে বোনের কাছে অনেক যত্নে ছিলো বাবু তবু মাঝে মাঝে চিন্তা করি আমি কিভাবে পেরেছিলাম এটা করতে।
তখন দুই মাস পাঁচ দিন আর পরবর্তী ট্রান্সফারের সময় দেড় মাসের মতো বাচ্চাকে মায়ের কাছে রেখেই চাকরি করেছি। আর এ দুটো গ্যাপই হয় বাচ্চার এক বছর বয়সের মধ্যেই। আর আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে আমি কিভাবে বাচ্চা রেখে জবে গেছি বা যাচ্ছি তাতে অনেকে অবাক হতো কিন্তু মনে পড়ে না যে কোন আল্লাহর বান্দা আমাকে এটা নিয়ে নেগেটিভ কিছু বলেছে । বরং সবাই বলেছে কি আর করবা চাকরি তো করাই লাগবে।
একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলি। আমি খুব খুব ফিল করি মেয়েদেরকে মাতৃত্ব শেখানো দরকার আছে। বাচ্চা হলেই সবাই সব শিখে যায় না। অন্তত আমি মাতৃত্বকে অনেক দেরিতে বুঝেছি।
তো যেখানে ছিলাম। কলেজে জয়েনের পরও সেইম সমস্যা। পুষ্পস্তবক দেয়াটা নিতেই পারছি না। এখানেও স্কিপ করা কঠিন। ছোট ডিপার্টমেন্টে কম টিচার থাকে। আমার ডিপার্টমেন্টে ছিলো তিনজন। আল্টিমেটলি ফুল দেয়ার সময় ডিপার্টমেন্টের হেড ইন্ডিভিজুয়ালি সবাইকে খুঁজে। ভদ্রলোক শাহাবাগি ঘরানার হওয়ায় আমার বেদিতে যেতে না চাওয়া, পিছনে থাকা বা ছবি তুলতে না চাওয়া নিয়ে বিরক্ত হন। আমি জয়েন করার আগ দিয়ে এক ডিপার্টমেন্টের হেড জাতীয় দিবসে কলেজে পৌঁছাতে দেরি করায়, আমি নিশ্চিত না হয়তো পনের বিশ মিনিট দেরি বোধ হয়, উনাকে প্রিন্সিপাল শোকজ করেন। হেড ভদ্রলোক হিন্দু ছিলেন।
এর মধ্যে দিন গড়াতে লাগলো। মেজো বাবাটার জন্ম হয়। এই সময় আমার মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন আসে হয়তো। নিকাব শুরু করি। প্রথম চাকরি ছাড়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। সবাইকে বলি। যথারীতি সবাই হালকা ভাবে নেয়।
আরও সময় গড়াতে থাকে। আমি খেয়াল করি যখন করে অফিসে কোন প্রেশার তৈরি হয় তখনই বাচ্চাদের সাথে ব্যবহার খারাপ হয়ে যায়। আর প্রেশার তো কাজেরই অংশ। সো অনেক চেষ্টা করেও আমি নিজিকে কন্ট্রোল করতে পারিনা।
একে একে বিভিন্ন বিষয় আমার নিজের জন্য মেনে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন প্রায়ই ডিপার্টমেন্টে কোন একজন পুরুষ সহকর্মীর সাথে একা থাকতে হয়। হোক টিচার অথবা পিওন। হয়তো অল্প সময়ের জন্য। আমার এটা খারাপ লাগতে শুরু করলো শুধুমাত্র ঐ হাদীসের জন্য যে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন একাকি কোন পুরুষ আর কোন মহিলা অবস্থান করলে তৃতীয় ব্যক্তি হয় শয়তান। যদিও আপাতদৃষ্টিতে খারাপ লাগার মতো কোনই ব্যাপার নাই।
ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের তিনটা সেকশনে প্রায় ছয় শ এর মতো স্টুডেন্ট থাকে। মোটামুটি অর্ধেকের বেশি ছেলে। আমার প্রত্যেক বছর এতো এতো গাইর মাহরাম এর সামনে লেকচার দেয়া খারাপ লাগে শুরু করলো। আমার চেহারা দেখা না গেলেও ভয়েস তারা শোনে।
এগুলো আসলে অনেক বড় সমস্যা না কিন্তু আমার নিজের জন্য আমি পছন্দ করতে পারিনা। আর আরেকটা কথা হচ্ছে এগুলো পড়ে মনে হতে পারে আমি চাকরি ছেড়ে অসূর্যস্পর্শা হয়ে গেছি। আসলে তেমনটা না। আমি বাজার করি। মাদ্রাসার হুজুরদের সাথে কথা বলি। কিন্তু আগে যেরকম পাইকারি গাইর মাহরামদের মধ্যে থাকতাম সেটুকু এখন নেই আলহামদুলিল্লাহ।
এরপর আসি পরীক্ষার খাতা দেখা। পরীক্ষার খাতা দেখার জন্য যে সময় পাওয়া যায় সেটা ইনাফ না। তার উপর আমি বাচ্চাওয়ালা মানুষ। সময় স্বল্পতার কারণে হোক বা নিজের গাফিলতি (যেহেতু জবাবদিহিতা নেই) বেশ দ্রুত খাতা দেখতাম। এতো দ্রুত খাতা দেখলে প্রপার ইভ্যালুয়েশন হয়না। কিছুটা কম বেশি তো হয়ই। একটা সময় মনে হতে লাগলো কাউকে যদি তার প্রাপ্যর চেয়ে কম দিয়ে ফেলি এটা তো হক নষ্ট।
আবার কলেজে অনেক সময় কিছু বাড়তি অর্থ হাতে আসে। যে অর্থের ভাগ প্রিন্সিপাল থেকে শুরু করে সবাই পায়। যার পুরোটা হালাল না। টাকাটা আমি নেব না এই কথা বলার মতো স্ট্রং পারসোনালিটি আমার নেই। হারাম না সেটা জানার পর থেকে আমি নিতাম, কিন্তু কাউকে দিয়ে দিতাম।
আমার মনে হতে লাগলো আমার আখিরাত আমি নিজের হাতে কঠিন করছি। আল্লাহ তো আমাকে বলেন নাই চাকরি করে দ্রুত খাতা দেখে অন্যের হক নষ্ট করতে। অথবা হারাম টাকা হাতে নিয়ে তারপর সেই টাকার জবাবদিহিতা করতে। আল্লাহ তো আমাকে কাঁদায় নামতেই বলেন নাই। আমি স্বেচ্ছায় কেন কাঁদায় নামবো আর কেনই বা কাঁদা পরিষ্কার করতে গোসল করবো!
আমাদের দেশের মানুষ মেজরিটি ধর্মপ্রাণ। ফলাফল হচ্ছে কিছু মানুষ আমাকে আমার হিজাব নিকাবের কারণে পছন্দ করতো। অনেক সময় আমাকে দিয়ে এক্সাম্পলও দিতো। আমার মতো হতে চাইতো। আর আমার ভয় লাগতো আমি “পর্দা করে সব করা যায়” এর রিয়েল লাইফ মডেল হয়ে গেছি যেখানে আমি নিজেই এই মটোর ঘোর বিরোধী। এটাও একটা সমস্যা।
আরো একটা ব্যাপার আমার মাথায় কাজ করতো। মনে হতো এই যে আমি জব করছি, আমি জানি না আমার উপার্জনে আল্লাহ তাআলা রাজি নাকি নারাজ। এই উপার্জন যদি আমি আমার সন্তানদের পিছনে খরচ করি তাহলে আমি আমার সন্তানদের যেমন দেখতে চাই জানিনা আল্লাহ কবুল করবেন কিনা।
তো এভাবেই চললো কলেজে সাড়ে ছয় বছর। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় পরিবারের সদস্যদের বলেছি। প্রথমে কেউই রাজি ছিলো না আমার বোন ছাড়া। আমার হাসব্যান্ড, শ্বশুরবাড়ি, বাবারবাড়ি কেউই না। এখানে আমার মায়ের কথা একটু বলা প্রয়োজন। আমার সত্যিই জব ছাড়তে চাওয়াটা সবার জন্যই ধাক্কা হলেও মার জন্য বিশাল বড় ধাক্কা। আমার বাবা মারা যান আমি যখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। তখন থেকে অনেক বেশি কষ্ট করেন মা আমাদের জন্য। দুই মেয়েকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান আলহামদুলিল্লাহ। আমার জবের সাথে আর্থিক নিরাপত্তা আর সামাজিকভাবে সম্মানজনক একটা অবস্থান তৈরি হয়। সেটা হঠাৎ করে নাই হয়ে যাওয়া মেনে নেয়া অনেক বেশি কঠিন। আম্মুর জন্য আরও কঠিন। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ উনাকে ধীরে ধীরে অনেক বেশি বুঝ আর দৃঢ় ঈমান দিয়েছেন। বাকিরাও ধীরে ধীরে মেনে নিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ।
এখানে দুয়েকটা কথা বলে শেষ করবো ইনশাআল্লাহ। আপুরা যারা জব ছাড়তে চান তারা একটু সময় নিয়ে নিজের সাথে ভালোভাবে বোঝাপড়া করেন। আপনি কিসের জন্য কি ছাড়তে যাচ্ছেন—সেটা আপনার নিজেকে খুব ভালোমতো বুঝতে হবে। বুঝতে হবে আপনি কি ত্যাগ করছেন আর কেন করছেন। আপনার এই ত্যাগের উদ্দেশ্য যেন হয়ঃ আপনি দুনিয়ায় আপনার একটা শক্তির জায়গা ছাড়ছেন মহা পরাক্রমশালী সর্বশক্তিমান আযীযুল গফুরের সামনে দাঁড়ানোর দিনে যেন আপনার হিসাব সহজ হয় সেই আশায়। আপনি দুনিয়াবি অর্থ, সম্মান, নিরাপত্তা এগুলো ছাড়ছেন শুধু এবং শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার জন্য। মাঝখানে আর কোন কথা নেই।
আর চাকরি ছাড়া মানেই সবকিছু সহজ হয়ে যাবে এমনটাও মনে করা যাবে না। দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদের পাঠিয়েছেনই পরীক্ষার জন্য। পরীক্ষা চলতেই থাকবে। ছোট ছোট এবং বড় বড়। আগেও ছিলো, পরেও থাকবে। পরীক্ষায় পড়ে আল্লাহ তাআলার প্রতি না শুকরি হলে, নিজের ডিসিশনের প্রতি সন্দিহান হলে যে জব ছেড়ে ভুল করলাম নাকি এমন হলে কিন্তু এতো বড় একটা স্যাক্রিফাস পুরো মাঠে মারা যাবে! এই তো! এতটুকুই। আল্লাহ তাআলা আমাদের গুনাহ গুলো মাফ করে দিন। আমিন।