দ্য থিওরি অফ অ্যাবসার্ডিযম নিয়ে আলোচনা শুরু করতেই অনিবার্যভাবে চলে আসবে অ্যালবার্ট ক্যামুর নাম। ক্রমান্বয়ে ধরা পড়বে স্যামুয়েল ব্যাকেটের নাটক “ওয়েটিং ফর গডো”। সাহিত্যের চুলচেড়া বিশ্লেষণে না গেলেও বেশ কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে।
এই দুনিয়াটা আমাদের কাছে রঙ্গমঞ্চের মতন। মুহূর্তে মুহূর্তে হেঁটে বেড়াই অলিতে-গলিতে। ঘটনার আকস্মিকতা আমাদের চমকিত করে। মাঝেসাঝে তীব্র যন্ত্রণায় আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে। যেন দৃষ্টিসীমা তেড়েফুঁড়ে চলে যেতে চায় অসীমে। বানের তোড়ে ভেসে যাওয়া রাখালের মতন আঁকড়ে ধরতে চাই খড়কুটো। বেঁচে থাকার অবলম্বন। জীবনের ভাঁজে ভাঁজে দুর্বিষহ লড়াইয়ের তাড়না আমাদের একটুও স্বস্তি দেয় না। একটুও বাঁচতে দেয় না। যেন বাঁচতে হয় বলেই বেঁচে থাকি। ভ্রমের মতন খানিকটা। হুঁশ ফেরার আগেই ফুরিয়ে যায় সব।
আলাপ শুরু করা যাক। দ্য মিথ অফ সিসিফাস।
সিসিফাসকে ঘুরতে হবে একই ঘটনার পরিক্রমায়।পাহাড়ের চূড়ায় বারবার ঠেলে তুলতে হবে পাথর, চূড়ায় উঠামাত্রই সেটা গড়িয়ে পড়বে তলদেশে। সিসিফাস ফের নামবে নিচে। ঠেলে তুলতে চেষ্টা করবে। চূড়ায় পৌঁছুবে। আবারো একই ঘটনা। আমাদের জীবনটা সিসিফাসের মতন। ছোট্টবেলা থেকে শুরু করে আজকের পর্যায় পর্যন্ত লক্ষ্য বা গোল পরিবর্তিত হতে হতে আমরা এখানে এসে পৌঁছেছি। ক্লাস ফাইভে গোল ছিল বৃত্তি। এরপর জেএসসি। এসএসসি। ভালো কলেজ এবং ভালো ইউনিভার্সিটি। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর তাড়না আমাদেরকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার উদ্যম দিয়েছে। নিজের সামগ্রিক মনোনিবেশ কেন্দ্রীভূত করে কেবলই নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে বলেছে। তবে এখানে খেয়াল করার বিষয় এই যে, লক্ষ্য সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল। একেকটা পর্যায়ে একেকটা নতুন সাফল্যের ফাঁদ আমাদের জন্য তৈরি।যেটুকু অর্জন করতে না পারলে আমরা ব্যর্থ।
কাম্যু বারবারই জোর দিয়ে বলেছেন, সিসিফাসকে একজন সুখী মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই যে জীবনের বাস্তবতা সিসিফাস বুঝতে পেরেছে এবং হাল ছেড়ে না দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অবিরাম - এটাই সিসিফাসকে মহিমান্বিত করেছে। এবং এজন্যই জীবন অদ্ভুত। অদ্ভুত এই অর্থে যে, সবকিছু অর্থহীন হলেও সেটাকে প্রশ্ন না করে মেনে নিয়ে চলতে পারাটাই সার্থকতা। সেটা সিসিফাস পেরেছে। কাজেই সে একজন হিরো। সার্থক হিরো।
এখানে, আমরা চিন্তাজগতের আরো কিছু দিক
উন্মোচন করতে পারি। সিসিফাসের সাথে আমাদের বৈরিতা ঠিক কোন জায়গায়?
বৈরিতা এই জায়গায়ই যে, জীবন কাম্যুর কাছে অর্থহীন। এই জীবনে প্রশ্ন করাও অর্থহীন। অর্থহীন জগতে অর্থের তালাশ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
কিন্তু মুসলিমের কাছে জীবন অযৌক্তিক নয়। এই জীবন একটা আমানত। আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত।একটা পরীক্ষা। কাম্যুর নৈরাশ্যবাদকে আমাদের আশাবাদী চিন্তা দিয়ে নাকচ করে দেওয়া যায়। কারণ আমাদের দেওয়া হয়েছে জান্নাতের ওয়াদা। জান্নাত যেমন সত্য, জাহান্নাম তেমনই সত্য। কাজেই সিসিফাস কেন একই কাজের পুনরাবৃত্তি করছে তা না জানলেও, আমরা কেন এই জীবনের বেড়াজালে জড়িয়ে হুকুম-আহকামে নিজেকে আটকে পথ চলার চেষ্টা করেই যাচ্ছি তা দিনের আলোর মতন পরিষ্কার। আমরা কাম্যুর মতন চোখমুখ বাঁকিয়ে বলতে পারি না - একটাই জীবন। কোনো দায়বদ্ধতা নাই। স্বাধীনতার সর্বোচ্চ স্বাদ ভোগ করার এটাই মোক্ষম সুযোগ।
বরঞ্চ আমরা তীব্র বিরোধের সাথে বলতে চাই,একটাই জীবন। আর এজন্যই সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতার সাথে এই জীবন কাটাতে হবে, যেন জান্নাতের দরজা আমাদের জন্য খুলে যায়। আল্লাহ পাক যেমনটা বলেছেন, হিসেব হবে প্রতিটা মুহূর্তের। অণু পরিমাণ সৎকাজের এবং অণু পরিমাণ জুলুমেরও।
পরিশেষে,কাম্যু আমাদের অর্থহীনভাবে টিকে থাকার কথা বলেছে এক অর্থহীন জগতে। কিন্তু একজন মুসলিমের কাছে দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, প্রতারণার পণ্য, খেলা-তামাশা বটে, কিন্তু একই সঙ্গে এটা আখিরাতের পরীক্ষার ময়দান। পরীক্ষার কেন্দ্রকে অর্থহীন বলে হেলায় হারায় না মুসলিমরা; কিংবা স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতাও করে না। কারণ আমাদের লক্ষ্য হলো আখিরাত। দুনিয়ায় নয়,বরং সবটাই আমরা জান্নাতে পাওয়ার আশা রাখি।