রমাদানের শুরুর দিকে একটা লেখা পড়েছিলাম, মিশর সেনাবাহিনীর এক ভাই, ছোট থেকেই চেইন ম্মোকার ছিলেন।আমাদের গাযার ভাই বোনদের আত্মত্যাগ, কষ্ট থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যে স্মোকিং শতবার চেষ্টা করেও ছাড়তে পারেননি, সেটা তিনি এখন ছাড়বেন। তিনি মূলত চেয়েছেন দ্বীনের জন্য পৃথিবীর এক প্রান্তের আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ন্যায় তিনিও ত্যাগ স্বীকার করবেন, সুবহানাল্লাহ!

এই ঘটনা থেকে অনেক বড় শিক্ষার বিষয় রয়েছে আমাদের জীবনে। বছর খানেক পার হয়ে গেলো, শহীদের সংখ্যা অর্ধলাখ ছাড়িয়ে গেলো, ছোট্ট ছোট্ট প্রাণ গুলো জান্নাতের সবুজ পাখি হয়ে গেলো, আর আমরা বসে আছি, শুধু দেখছি।

আমাদেরও কি ত্যাগ শিকার করা উচিৎ নয়?

আমরা দ্বীনের জন্য কতটুকু ত্যাগ শিকার করেছি?

আমরা জানি,আত্মার সাথে মানুষের দেহের সংযোগ আছে।আমরা একটা প্রবাদ পড়েছি,

A sound mind lives in a sound body.

বিশ্বাস করেন, আমাদের আত্মা প্রস্তুত থাকলে দেহ প্রস্তুত থাকবে। দেহ প্রস্তুত থাকলে আত্মা প্রস্তুত থাকবে। একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা সম্ভব নয়।

আর প্রস্তুত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। আপনি আত্মিক দিক ঠিক না করে, আল্লাহর জন্য কোন গুনাহ, কোন অযথা কাজ ত্যাগ না করে আপনি আশা করে বসে থাকলেন যে যুদ্ধ শুরু হলে আপনি ঝাঁপিয়ে পড়বেন, এমন চিন্তাধারাতে এখনই ফুলস্টপ দিন।

সময় থাকতে এখনই প্রস্তুতি নিন।

আমরা কী করতে পারি এক্ষেত্রে? যা যা করতে পারি ইনশাআল্লাহ -

নিজেদের ভুলত্রুটি সংশোধনের দিকে মনোযোগ দিন। গুনাহ হচ্ছে না কিন্তু সময় নষ্টকারী কাজ-কারবার হচ্ছে, সেটা বাদ দিয়ে সময়টাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। নিজেদের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাইতে থাকুন এবং জালিমদের জন্য বদদুয়া করতে থাকুন।

পরিচিত বিশ্বস্ত ফান্ডগুলোতে আমাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত ভাই বোনদের জন্য সাদাকাহ, যাকাত দিন।

জালিমদের পণ্যগুলোকে নিজে বয়কট করুন, অপরকে বয়কট করতে উৎসাহ দিন।

যে পাপ বা অযথা কাজকে আপনি বহুদিন ধরে ত্যাগ করতে চাচ্ছেন এখনই সময় তা ত্যাগ করার।

যখনই দুনিয়াবি চিন্তা এসে গ্রাস করবে, একবার শুধু ফিলিস্তিন, সিরিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের নিরীহ মুসলিমদের উপর করা নির্মম গণহত্যার কথা, তাদের আপনজন হারানোর বেদনার কথা স্মরণ করুন, কাফিরদের নির্মমতার কথা স্মরণ করুন, ভিডিও দেখুন, আর কিছু লাগবে না।

মোটকথা, আমাদের যা যা করা সম্ভব দুনিয়ার এ প্রান্ত থেকে আমরা যেন তা করতে পারি, করার চেষ্টা করি। আর বিশ্বাস করুন, ওয়াল্লাহি (আল্লাহর শপথ) এ প্রস্তুতি, এ চেষ্টা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আপনি পূর্ণাঙ্গ মুমিন হয়ে উঠবেন। আজ আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের সাথে তারাই জুলুম করছে, যাদের এবং যাদের আদর্শের পিছনে পুরো বিশ্ব ছুটছে।

আর কতদিন পশ্চিমাদের অনুসরণ করে, আবার তাদের বাতলানো পথেই এই উম্মাহর মুক্তি চান? আর কত এই খুনি, জালিমদের আদর্শ আঁকড়ে বাঁচতে চান?

যদি আপনি আপনার ভাই বোনদের জন্য কিছু করতেই চান, এ দ্বীনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতেই চান, আপনাকে মুমিন হতে হবে। কেবল আর কেবলমাত্র মুমিনরাই দ্বীনের পূর্ণতা অর্জন করেছে, দ্বীনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীদের জীবন থেকে আমরা দেখতে পাই।

এই উম্মাহর মধ্যে শ্রেষ্ঠ অংশ ওই অঞ্চল গুলোতে। তারাও দ্বীনের জন্য কঠিনতর ত্যাগ স্বীকার করছে। আমাদের দেখতে হবে কুরআনে, হাদিসে মুমিনদের কোন কোন গুণের কথা বলা হয়েছে, কোন কোন গুণকে আল্লাহ ভালোবাসেন,সেগুলো জানতে হবে, অর্জন করতে হবে।নিজের মনের খাহেশাত, নফসের গোলামি ত্যাগ করতে হবে। নিজের মধ্যে ফাঁকফোকর রাখা যাবে না।

দুনিয়া ইনজয় করার জায়গা না, অন্তত আমাদের মুসলিমদের জন্য তো না-ই। উম্মাহর এই কঠিন সময়ে, দেহের এক অংশের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নিজেদের আনন্দ, শখগুলোকে একপাশে রেখে আগত কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুতি যেন জারি রাখতে পারি, তাদের কষ্টে আমরাও যেন শামিল হতে পারি, তাদের যেন এই দুনিয়াবি ব্যস্ততার দরুন ভুলে না যাই, সব সময় যেন তাদের স্মরণে থাকে - সেই দুআ, তওফিক কামনা করি রবের নিকট।

সেই সাথে প্রয়োজনীয় ইলম, ইতিহাসের জ্ঞান গুলো যেন আমরা এই সময়ে অর্জন করে নিই। বিশ্বাস করেন, দেহের এক অংশের কষ্টে জর্জরিত হয়ে আমাদের শখ, আহ্লাদগুলো ত্যাগ করার জন্য আমরা অবশ্যই প্রতিদান পাবো ইনশাআল্লাহ। আর আল্লাহ বলেন,

“কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখতে পাবে।” (সুরা যিলযাল)

বরং তাদের কষ্টে ব্যথিত না হয়ে, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আমরা যেন মুনাফিকদের ন্যায় আচরণ করে না বসি। এই কষ্ট, এই ত্যাগের বিনিময়েই তো জান্নাত আসবে। একদম পেইনলেস, সহজ একটা জীবন পার করে কি জান্নাত হাসিল করা সম্ভব? আমার রাসুল (স) তো বলেছেন,

“জান্নাতকে কষ্ট আর দারিদ্র্য দিয়ে আচ্ছন্ন করা হয়েছে,আর জাহান্নাম যাওয়ার পথকে সহজ করা হয়েছে।”

এই যে ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষাগুলোকে কি জান্নাতের জন্য ত্যাগ করা যায় না, বোন? মনে করবেন, এখন এই কঠিন সময়ে আল্লাহর জন্য আমার শখ, ইচ্ছেগুলোকে ত্যাগ করছি। জান্নাতে গিয়ে আমার রবের নিকট আমার ইচ্ছে, শখগুলো ডানা মেলবে ইনশাআল্লাহ। আর জান্নাতে গিয়ে এত এত সুখ, শান্তি দেখে মনে হবে, দুনিয়াতে যদি আরও কষ্ট, ত্যাগ স্বীকার করতে পারতাম!

এই তো আর কিছু দিন দুনিয়ায় কষ্ট করে অতঃপর জান্নাতে।বলুন, এর চেয়ে সুন্দর সমাপ্তি আর কোন জিনিসে নিহিত হতে পারে?

বিশ্বের একপ্রান্তে থাকা আমাদের ভাই বোনদের আত্মত্যাগ শুধু আর শুধু মাত্র দ্বীন ইসলামের জন্য, আমরাও যেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে বলতে পারি,

রব্বি, তারা যেভাবে আত্মত্যাগ করেছে আমরা সেভাবে পারিনি, কিন্তু নিজেদের দিক দিয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করা দরকার তা করেছি বা করার চেষ্টা করেছি, তাদের ন্যায় আমাদের ত্যাগগুলোকেও কবুল করুন।আমরা নিজেদের প্রস্তুত করেছি, সেই কঠিন দিনগুলোর জন্য। তাদের ন্যায় আমাদেরকেও আপনার পথে শহিদ হিসেবে কবুল করুন।

সময় নিকটে, যখন যুদ্ধের দামামা বাজবে, আমরা যেন নিজেদের অপ্রস্তুত অবস্থায় না পাই।

প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু হোক, ছোট ছোট প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে।দিন শেষে ইসলামের বিজয় হবেই, এই সুসংবাদ স্বয়ং হাদিসে এসেছে। কিন্তু ইসলামের সাথে আমরাও জয়ী হবো নাকি পশ্চাৎপদদের অন্তর্ভুক্ত হবো, তা শীঘ্রই উদ্ভাসিত হবে।

আল্লাহ আমাদের হকপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তওফিক দিন, আমাদের অন্তর থেকে দুনিয়াপ্রীতিকে আখিরাতের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করুন, আমিন।