“শুধু এক মেয়ের জন্য পুলিশের বিরুদ্ধে যু’দ্ধে নেমে পড়ে পুরো শহরের মানুষ। একটা ধর্ষ’ণের বিচার আদায় করতে প্রাণ যায় আরও সাত জন মানুষের।”
ঘটনাটা ১৯৯৫ সালের।
বাংলাদেশের মফস্বল প্রান্ত উত্তরবঙ্গ, উত্তরবঙ্গের মফস্বল এক জেলা দিনাজপুর। এই ছোট শহরটা পুরো বাংলাদেশের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিল শুধু এক কিশোরীর জন্য।
মেয়েটার নাম ছিল ইয়াসমিন। বয়স আনুমানিক ১৪-১৫ বছর। ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাড়িতে সে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত, ১২ বছর বয়স থেকে। বাবা মারা গিয়েছিল অনেক আগেই৷
২৩ আগস্ট, ১৯৯৫
মায়ের টানে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় ইয়াসমিন।
২৪ আগস্ট, ১৯৯৫
আনুমানিক ভোর ৪ টায় হাসনা এন্টারপ্রাইজ বাসটি ইয়াসমিনকে দিনাজপুর দশ মাইল মোড়ে এনে নামিয়ে দেয়। রাস্তা ঘাট তখন একদম ফাঁকা।
ফজরের সালাতের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মুসল্লিরা তখন ইয়াসমিনকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য পুলিশের একটা ভ্যানে তুলে দেয় তাকে।
সে গাড়িতে ছিল এক এসআই, আর দুই কন্সটেবল।
এই পশু’ রা ১৪ বছরের ইয়াসমিনকে ভ্যান গাড়ির মধ্যে ধর্ষ’ণ করে, তারপর হ”ত্যা করে, তার লা”শ ভ্যান থেকে ফেলে দেয় উত্তর গোবিন্দপুর গ্রাম এলাকার দিকে।
তখন ভোর, সবদিকে সবকিছু ফাঁকা। কিন্তু কিছু মানুষ দেখেছিল যে পুলিশের ভ্যান থেকে কিছু ফেলে দেওয়া হয়েছে। পরে গ্রামের লোক গিয়ে দেখে একটা কিশোরীর রক্তা’ক্ত লা’শ!
তারা ছুটে যায় সেখানের এমপির কাছে। গিয়ে জানায় যে, পুলিশ তাদের গ্রামে এক কিশোরীর রক্তা’ক্ত লা’শ ফেলে দিয়ে গিয়েছে।
তৎকালীন এমপি উত্তরবাংলা পত্রিকার সম্পাদককে বিষয়টা জানায়৷ সাংবাদিক ইয়াসমিনের ছবি নিয়ে স্থানীয়দের থেকে বর্ণনার ভিত্তিতে একটা নিউজ তৈরি করে। পুলিশ সে নিউজ প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিল৷ এমনকি সেদিন রাতে উত্তরবাংলা পত্রিকার অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে সাংবাদিক নিউজটা ছাপান।
২৫ আগস্ট, ১৯৯৫।
পুলিশ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ইয়াসমিনের লা’শ উদ্ধার করে কোন এক অজ্ঞাত কিশোরীর লা’শ আখ্যা দিয়ে জানাজা-কাফন ছাড়াই ইয়াসমিনকে দাফন করে দেয় এক কবরস্থানে।
ততক্ষণে পত্রিকা সবার হাতে হাতে পৌঁছে গিয়েছে, সন্ধান পাওয়া গিয়েছে ইয়াসমিনের পরিবারের। ক্ষোভে ফেটে পড়েছে সর্বস্তরের মানুষ।
২৬ আগস্ট, ১৯৯৫
দিনাজপুরের সাধারণ মানুষ ইয়াসমিনের বাড়ির দিকে আসা শুরু করে, ইয়াসমিনের এলাকায় সন্ধ্যাবেলায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়। জানাজা শেষে সাধারণ মানুষ মিছিল করে এগিয়ে যায় দিনাজপুর কোতয়ালি থানার দিকে। সারারাত থানা অবরুদ্ধ করে রাখে সাধারণ জনতা।
সে রাতে কোন পুলিশ থানা থেকে বের হতে পারেনি।
২৭ শে আগস্ট, ১৯৯৫
হাজার হাজার মানুষ পুলিশের বিচারের দাবিতে রওনা দেয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দিকে। হাজার হাজার মানুষের এই মিছিলে হামলা শুরু করে পুলিশ। লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ শুরু করে। সেদিন মিছিলে একে একে সাত জন মানুষ নি”হত হয়। হ্যাঁ, সাত জন!
এক কিশোরীর ধর্ষ’নের বিচার আদায় করতে প্রাণ দিতে হয়েছিল সাত জন ব্যক্তিকে।
তবু দিনাজপুরের মানুষ থেমে যায় নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সে রাতেই বদলি করা হয় পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসককে, সেই সাথে দিনাজপুরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
দিনাজপুরের মানুষ ১৪৪ ধারাকে কোনোরকম পরোয়া না করে একযোগে রাস্তায় নেমে আসে। টানা আন্দোলন চলতে থাকে পুরো শহরে। থানাগুলো সব ফাঁকা, কোথাও কোনো পুলিশ নেই৷
পুরো দেশের সাথে দিনাজপুরের যোগাযোগ একদম বন্ধ। সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ, অফিস-আদালত বন্ধ, স্কুল-কলেজ বন্ধ। শহরের সব মানুষ রাস্তায়৷ সবার একটাই প্রতিজ্ঞা - পুলিশ দেখলেই মারবো।
শহরের মানুষ ঘোষণা করে পুলিশকে কেউ বাড়ি ভাড়া দিবে না, কোনো দোকানদার পুলিশের কাছে কিছু বিক্রি করবে না, কোন ডাক্তার পুলিশকে কোনো চিকিৎসা দিবে না।
২৯ আগস্ট ভোরের আলো পত্রিকায় ছাপা হয়,
পুরো শহর যেন এক প্রেতপুরী, পুলিশ যেন গা ঢাকা দিয়ে আছে। কোথাও কোনো পুলিশ নেই। এক রিকশায় মালপত্র দেখে তাকে থামানো মাত্র রিকশাওয়ালা বলল, এগুলোর পুলিশের জিনিস নয়। ওদের জিনিস রিকশায় তোলার প্রশ্নই আসে না।
টানা পাঁচ দিনের আন্দোলনের পর, ১০৫ জন পুলিশকে বদলির পর, ময়নাতদন্তের জন্য ইয়াসমিনের লা’শ কবর থেকে তোলা হয়। আদালতে মামলা দায়ের হয় পুলিশের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইয়াসমিনের মামলা দিনাজপুরের আদালত থেকে রংপুর আদালতে পাঠানো হয়েছিল। ময়নাতদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়া সেই তিন পুলিশের ফাঁ’সির রায় দেয় আদালত, যা কার্যকর হয়েছিল ২০০৪ সালে।
১৯৯৫ এর আগস্ট থেকে ২০২৫ এর আগস্ট, সেই ইয়াসমিন হরতালের ৩০ বছর পেরিয়ে গেল।
ইয়াসমিনরা মরে না, এরা বারবার জন্মায়। কখনো আসিয়া হয়ে, কখনো তনু হয়ে।
ধর্ষ’কেরা সাবধান হয়ে যাও৷ এক ইয়াসমিনের জন্য দিনাজপুরের মানুষ পুরো পুলিশ প্রশাসনের এই অবস্থা করলে তোমাদের কী করতে পারে একবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে নাও।
ইয়াসমিন হরতালের ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও দিনাজপুরের মানুষের মধ্যে, শুধু দিনাজপুর নয় - পুরো বাংলাদেশের মুসলিমদের ঠিক একই পরিমাণই উদ্যম আর সাহস আছে যে, তারা নিজেদের মেয়েদের সম্মান রক্ষার জন্য নিজেদের প্রাণও বিসর্জন দিতে পারে৷
দেশের প্রত্যেক ইয়াসমিনের জন্যই তারা এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।