নারীরা সংসারে নিপীড়িত বা সহিংসতার শিকার হতে পারে, তার স্বামী, বাবা বা আপন আত্মীয় তার দায়-দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করতে পারে, সংসারে তার কোন মর্যাদা না থাকতে পারে যদি তার আর্থিক কোন অবদান না থাকে—এ জাতীয় কথা প্রায়ই শোনা যায়। তাই অনেকে মনে করেন চাকুরিই হতে পারে এই সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান। আসলেই কি তাই?

আমি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিরোধী নই বা তার শিক্ষার্জনেরও না। তবে, এই চাকুরি ও শিক্ষা যদি একজন নারীকে সংসার বিমুখী করে তোলে বা সন্তান জন্মদানে অনাগ্রহী করে কিংবা তাকে এমন কোন পরিবেশে বা পরিস্থিতিতে ফেলে যা তার বর্তমান নিরাপত্তার জন্য হুমকি ও ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক—সেখানেই আমার আপত্তি। আমি এমন বোনকে চিনি যার সন্তান হয় না, এবং সে পর্দা করে ইসলামী পরিবেশে চাকুরি করছে, আমি বলব না—“বোন চাকুরি করো না।”

আমি নিষেধ করি আমার সেই বোনদের যাদের বাসায় ছোট ছোট বাচ্চা আছে, যাদের চাকুরির পরিবেশ মোটেও ভালো নয়। কেন করি? তার বাচ্চাদের জন্য করি, তার নিজের ঈমান ও আখলাকের নিরাপত্তার জন্য করি। আমার স্বার্থ কোথায়!

অনেক বাবা-মা মনে করেন, তাদের মেয়েকে চাকুরি করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, যেন স্বামী অত্যাচারী হলেও সে আর্থিক কষ্টে না ভুগে। তাদের উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ। কিন্তু চাকুরী তার জীবনক্যা আরও কঠিন করে দিতে পারে এবং তার সন্তানদের জীবনকেও, সেটা তাদের মাথায় থাকে না।

আমাদের সমাজে চাকুরিকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার একমাত্র পথ মনে করা হয়, আমি কিন্তু তা মনে করি না। আমি দেখেছি, একটা মেয়ে শিশুর অনেক সম্ভাবনা থাকে। সে অনেক কিছু করতে চায়। কিন্তু বাবা-মা তার লেখাপড়া ছাড়া আর কিছুই করাকেই অপছন্দ করেন। দিনরাতে জীবন-যৌবন দিয়ে শুধু পড়তে হবে—এটাই তার একমাত্র দায়িত্ব হিসেবে পারিবারিকভাবেথক শেখানো হয়। তার স্কিল ডেভোলেপমেন্টের ইচ্ছা মুকুলেই ঝরে পড়ে। সবাই যে লেখাপড়ায় সমান ভালো না, এটাও তারা বুঝতে চায় না। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন থাকে না, কেবল চাকুরি করা বা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই হয়ে যায়। এভাবে একজন ছেলে বা মেয়ে তাদের দায়িত্বের পরিধি নির্ধারণ করতে অক্ষম হয়ে যায়। যদিও রুটিরুজি পুরুষের প্রধান দায়িত্ব তাই তাদের ক্ষেত্রে খুব একটা সমস্যা করে না, তবে নারীরা এই ইঁদুর দৌড়ের চক্রে পড়ে তাদের প্রধান দায়িত্বে অবহেলা করছে। তারা হয়ে উঠছে টাকা কামানোর মেশিন—তাদের স্বামী, সন্তান ও সংসারের অন্যরা তাদের উপার্জিত অর্থের উপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে, যদিও তারা উপার্জন না করলেও সব চলতো। আমি জানি, অনেক চাকুরীজীবী বোনের ব্যাংকের চেক বই বা এটিএম কার্ড থাকে স্বামীর কাছে, স্বামী না চাইলে টাকা তুলতে পারে না। এই হল তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা!

অন্যদিকে, আমি চিন্তা করি, সেসব নারীর কথা যারা সন্তান প্রতিপালন, সংসার সামলে সমাজে অবদান রাখে, প্রতিনিয়ত স্কিল ডেভেলপমেন্ট করে, জ্ঞানার্জন করে; আর যদি সেখান থেকে কোন আয়-রোজগার হয়, তবে তা তার নিজের। আমি সত্যি আমাদের সংসারী নারীদের প্রতিভা দেখে বিস্মিত। একজন চাকুরিজীবী নারী কেবল অফিসে কাজ করতে করতে এতটা ক্লান্ত হয়ে যায় যে নিজের বাচ্চা ও সংসার সামলাতে হিমশিম খায়, সেখানে একজন গৃহিণী বাচ্চা ও সংসার সামলে কত কিছু করছে! একেকজন মা যেন একেকজন বিজ্ঞানী। তারা বাচ্চা প্রতিপালন, তারবিয়াত ও শিশুদের শেখানোর নতুন নতুন থিউরী আবিষ্কার করছে।

সেগুলো তারা অন্য মায়েদের সাথে শেয়ার করছে, কেউ কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করছে, কেউ বা আবার রান্নাবান্না করে হোম ডেলিভারি করছে, কেউ কেউ নিজের বাচ্চাদের সাথে আরও দু-চারটা বাচ্চাকে শিখাচ্ছে। কেউ কেউ ইলম অর্জন করছে ও অন্য নারীদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে জ্ঞানের আলো—মাশাআল্লাহ। এগুলো হয়তো কেউ আর্থিক সংকটে পড়ে করে, কেউ বা আবার শখে করে, আবার কেউ করে অবদান রাখার জন্য। তারা চাকুরি করে না বলে তাদের অবদানকে আমরা ছোট করতে পারি না।

এখন কোন নারীর স্বামী যদি অত্যাচারী হয় কিংবা কারো স্বামী মারা গেলে সে কি করবে? কে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে? পথে পথে ভিক্ষা করবে? ইসলামী আইনে পরিচালিত দেশে, এই প্রশ্ন আসবেই না। কিন্তু আমাদের তো সেই সৌভাগ্য এখন পর্যন্ত নেই কিন্তু তারপরও বলছি, না সে ভিক্ষা করবে না। রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। স্বামী বা বাবা একজন নারীর রিজিক তার কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম। তারা রিজিকদাতা নয়। মাধ্যম পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু রিজিকদাতা পরিবর্তন হয় না। আল্লাহ তায়ালা কীভাবে রিজিক দেবেন সেটা তিনি জানেন। তবে আমরা কেবল চেষ্টা করতে পারি। আমরা ইলম অর্জন করি, স্কিল ডেভেলপমেন্ট করি, অবসরকে কাজে লাগাই, সমাজে অবদান রাখার চেষ্টা করি—রিজিক স্বামী, বাবা নাকি আমার নিজের হাতে দেবেন সেটা আল্লাহর ইচ্ছা। হাদিসে এসেছে, “রাসূল ﷺ বলেছেন: ‘যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ তাকে যথেষ্ট করেন। তোমরা যদি আল্লাহর উপর সঠিকভাবে তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন যেমন পাখিকে দেন; সকালবেলা খালি পেটে বের হয়, সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)”

স্বামীর কিছু যদি হয় সেই ভয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য শুরু থেকেই চাকুরি করার (সংসার ও সন্তানের হক যথাযথভাবে আদায় না করে) বিষয়টা শুনতে অনেকটা এমন নয় কি, এক লোক প্রতিমাসে বেতন থেকে ৫ হাজার টাকার ডিপিএস করে, এর কারণ জানতে চাইলে সে বলে, যদি বড় কোন অসুখ-বিসুখ হয়, তাই পূর্ব প্রস্তুতি। সেই ব্যক্তি নিশ্চিত নয়, তার বড় কোন অসুখ হবে কিনা! কথায় আছে— “নিয়তের গুণে বরকত হয়”। এরপর দেখা যায় ওই ব্যক্তির সত্যি কোন বড় অসুখ হয়ে গেল আর সারাজীবনের জমানো অর্থ নিমিষেই শেষ!

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আশঙ্কাকে ঘিরে বর্তমানের দায়িত্বে অবহেলা না করি। আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব—সন্তান প্রতিপালন, স্বামী-সংসারের হক—এগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। রিজিকের ব্যবস্থা তিনিই করবেন।