শালীনতা শব্দটা এখন খুব হালকা হয়ে গেছে।
এক সেলেব্রিটি নারী যেসব নারীরা কামাই করে না তাদের ব্যাপারে নাক সিটকে বলছিল, নিজেরা এক পয়সা কামানোর মুরোদ নেই, কিন্তু যারা নিজের টাকায় চলেফিরে, ঘুরতে যায়, শপিং করে, তাদেরকে শালীনতা শেখাতে আসে। ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড না বললেও কথার মূলভাবটা এমনই ছিল। এখনকার যুগে হয়ত নিজের টাকা উপার্জন করতে পারা, নিজের টাকায় শপিং করতে পারা, নিজের টাকায় ঘোরাফেরা করতে পারা অনেক বড় বিষয়। এত বড় বিষয় যে এই জিনিসগুলোই হয়ে যায় একটা মানুষকে বিচারের মানদণ্ড।
আচ্ছা, আপনার মা, কিংবা নানী বা দাদী, তাদের কি নিজস্ব উপার্জন ছিল? যাদের নিজস্ব উপার্জন নেই, তারা কি কোনো মতামত দিতে পারবে না? যারা নিজেরা উপার্জন করে না, তারা কি অথর্ব, অজ্ঞ কিংবা জ্ঞানবুদ্ধিহীন জড়বস্তুর চেয়েও বোকা, যে তারা ভুল-ঠিকের ব্যাপারে কোনো কথাই বলতে পারবে না? যারা নিজেরা টাকা কামায় না, তাদের কি সমাজের প্রতি কোনো দায় থাকে না? তারা ভালো-খারাপ, ঠিক-ভুল, শালীন-অশালীন কোনো কিছু নিয়েই বলার অধিকার রাখে না?
আপনি একটা মানুষকে কীসের ভিত্তিতে মাপেন?
আমার নানু কখনো নিজে উপার্জন করেন নি। অথচ আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে অসাধারণ একজন নারী ছিলেন নানু। তিনি অল্প বয়সে বিয়ে করেন, খুব কম বয়সেই দুই সন্তান ছোট থাকা অবস্থাতেই স্বামীকে হারান। দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় উনি বিধবা হিসেবে কাটান। আমি কখনও দেখিনি, তিনি কোনো পরপুরুষের সাথে হেসে হেসে গল্প করছেন। কখনও দেখিনি তিনি অশালীন পোশাকে থেকেছেন। একদিন নানুকে নিয়ে শখ করে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। কী একটা কাজ সেরে নানুকে নিয়ে খেতে গেলাম স্টার কাবাবে। সেখানে জোড়ায় জোড়ায় জুটি বসা। কেউ কারো গায়ে ঢলে পড়ছে। এসব দেখে নানু খুব বিরক্ত হলেন। তিনি নিজে সারাজীবন শালীনভাবে থেকেছেন, আমাদেরকেও শালীনভাবে চলতে বলেছেন। আচ্ছা, এই যে আমার নানু শালীনতা পছন্দ করতেন, বেহায়াপনা, নাচগান পছন্দ করতেন না, ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা অপছন্দ করতেন, এসব নিয়ে খুব স্পষ্টভাবে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করতেন, এর জন্য কি নানু “খারাপ” হয়ে গেলেন? এর জন্য কি আমরা এখন উনাকে নিচু চোখে দেখব? জাস্ট বিকজ উনি নিজে “কামাই করে নিজের টাকায় শপিং করেন না” সেজন্য কি উনাকে আমরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করব?
আমরা যে চিন্তাগুলো ক্যারি করি, এগুলো কখনো কখনো খুব ভয়ংকর রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়।
এখনকার সমাজে অবৈধ সম্পর্কের মেলা বসেছে। বেশিরভাগ সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়াবে না জেনেই ছেলেমেয়েরা রিলেশনশিপে জড়াচ্ছে। বিছানা শেয়ার ডালভাত হয়ে যাচ্ছে। অথচ কারো প্রতি কারো লয়ালটি নেই। বিয়ের পরেও স্বামী কিংবা স্ত্রী অন্য কারো সাথে জড়িয়ে পড়ছে। বহু বছরের সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। কেন এরকম হচ্ছে? এর কারণ কি কখনো ভেবে দেখেছেন?
আমার এক আত্মীয়া ভীষণ সুন্দরী, এডুকেটেড আর স্মার্ট। দীর্ঘদিন প্রেমের পরে বিয়ে হয় উনার। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী বলতে শুরু করে, তুমি এমন ভাবে থাকো কেন? অমুক ভাবীর মতো স্মার্ট হতে পারো না? খোলামেলা পোশাক পরতে পারো না? বাইরে স্মার্ট কোনো জব করতে পারো না? এমনকি স্বামীর মন যুগিয়ে চলার হাজারো সাধনা করার পরেও তার স্বামী একসময় পরকীয়াতে জড়িয়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ইন্সটায় তারা বেশ ‘হ্যাপি কাপল’, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভিতটা এতটাই নড়বড়ে যে সম্পর্কের যায়-যায় হাল।
আরেক পরিচিত নারীর কথাই বলি। ধরুন, এই নারীর নাম তন্বী। তিনিও শিক্ষিত, অনেক দিন প্রেম করার পর দুজন দুজনকে বুঝেশুনে বিয়ে করেন। এখন বাচ্চাকাচ্চাও হয়েছে। তিনি স্বামীকে সবসময় সাপোর্ট করেন, চাকরি-বাকরি করে সে টাকাও পরিবারে ঢালেন। এরপরেও তার স্বামী তার ব্যাপারে খুশি না। স্ত্রীর আড়ালে-আবডালে কাউকে সামনে পেলেই বলে বসেন, তন্বীকে একটু চাকরি-বাকরি করতে বলতে পারেন না ভাবি? ও তো কিছুই বুঝে না। অথচ সেই মহিলা সবার সাথে যথেষ্ট অমায়িক, উনার ইন্টারপারসোনাল স্কিল চমত্কার। কিন্তু সমস্যা হলো, উনাদের সার্কেলে এমন আরো কিছু “ভাবি” আছেন, যারা তার মতো শিক্ষিত না হয়েও তার চাইতে “বেটার” জব করেন, তার চাইতে বেশি “কামাই” করেন, তার চাইতে বেশি “স্মার্ট”।
আমি খেয়াল করে দেখেছি এরকম অনেক সংসার আছে, যেখানে স্বামী তার স্ত্রীকে সম্মান দেয় না, কারণ স্ত্রী ‘ইনকাম’ করে না, বা ইনকাম করলেও লোকের সম্মান পাবার মতো “যথেষ্ট” পরিমাণে ইনকাম করে না। এমন অনেক পরিবার দেখেছি যেখানে অসাধারণ ব্যক্তিত্বের নারীদেরকেও গুরুত্ব দেয়া হয় না, কারণ সে টাকা উপার্জন করে না। অথচ সংসারে তার অবদানই সবচাইতে বেশি। এমন অনেক মেয়ের কথা শুনেছি, যারা এই দুষ্টচক্র ভাঙতে না পেরে, বাধ্য হয়ে টাকা কামাইয়ের পথকেই একমাত্র সমাধান ভেবে নিয়েছে, মানুষের থেকে সম্মান এবং গ্রহণযোগ্যতা পাবার আশায়, নাহয় যে লোকে “মানুষ” বলেই তাকে গণ্য করবে না। অনেক পরিবারে ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত মাকে মানুষ হিসেবে দাম দেয় না, কারণ মা তো চাকরিবাকরি করে না।
আসলে স্মার্টনেস, শিক্ষা বা চাকরি যখন মানুষকে মাপার মানদণ্ড হয়ে যায়, তখন এমনটাই হয়।
ইনকামকে মর্যাদা বানানোর মাপকাঠি বানাতে গিয়ে দিনশেষে আমরাই ঠকে যাই।
যে নারী নিজের বহু চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে, পাহাড়ের সমান ধৈর্য্য আর আকাশের সমান মায়া নিয়ে সংসারের পিছে নিজের সমস্তটা ঢেলে দেয়, তাকে কেন শুধুমাত্র “ইনকাম” না করার কারণে অসম্মান করা হবে?
যে নারী নিজের স্বপ্ন, নিজের সফলতার পিছে না ছুটে, পরিবার, স্বামী, সন্তান, সংসারের জন্য হাসিমুখে নিজেকে বিলিয়ে দেয়, তাকে কেন “গুরুত্ব” পেতে হলে আরো ফিনান্সিয়ালি ইন্ডিপেন্ডেন্ট হতেই হবে?
যে মানুষটার জন্য সংসারের অন্য সবগুলো সদস্য শান্তিতে খেয়েপড়ে নিজেদের কাজ করতে পারছে, তাকে কেন নিজে টাকা কামাই করে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে?
সে উপার্জন না করলে কি আমরা তার কথা শুনব না?
তার ব্যক্তিগত আয় না থাকলে কি সে নিজস্ব মত দিতে পারবে না?
টাকা কামাই না করার অর্থ কি সে কামাই করতে পারা নারীদের তুলনায় অক্ষম, অযোগ্য, সম্মান পাবার অনুপযুক্ত?
অর্থ উপার্জনই কি তবে মানুষকে “মানুষ” বানায়?
নিজেকে মানুষ এখন খুব বেশি প্রাধান্য দেয়। নিজের চাওয়া-পাওয়া, নিজের স্বপ্ন, নিজের সফলতা। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে, মা-বাবার ইচ্ছা, খুশি সবকিছু উপেক্ষা করে প্রবাসে চলে গেছে, নিজের বেটার ক্যারিয়ারের আশায়। এমন না যে, বাবা-মায়ের সাথে থাকলে তার ক্যারিয়ারের ক্ষতি হচ্ছিল, সে যথেষ্ট সফল ছিল। তবুও আরো বেশি সফলতা, আরো বেশি স্বাধীনতার লোভে সে প্রবাসে চলে গেল। বাবামায়ের খেয়াল রাখার বদলে নিজের ছোটখাটো শখ-আহ্লাদ পূরণ তার কাছে অনেক বেশি জরুরি। সে বাবা-মাকে ফোন দিয়ে খোঁজ নেয়ার সময় পায় না, কিন্তু প্রত্যেক উইকএন্ডে ঘুরতে তাকে যেতেই হবে মাস্ট। বাবা-মায়ের প্রয়োজনে সে টাকা দেয় না, কিন্তু নিজের টাকায় ঘোরাঘুরি আর নিজের টাকায় শপিং করে নিজেকে সে বিশাল কিছু মনে করে।
আচ্ছা, কী হবে এমন টাকা দিয়ে যা আপনার বাবা-মায়ের কোনো উপকারেই আসলো না? কী হবে সেই টাকা দিয়ে যা আপনি খালি স্বার্থপরের মতো নিজের জন্য ব্যয় করলেন? কী হবে সেই টাকা দিয়ে, যা শুধু মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শেখায়? টাকাই যদি মর্যাদার মানদণ্ড হয়ে যায়, তাহলে আপনার চাইতে বেশি আর্নিং করা মানুষটাকে সামনে পেলে সবাই কাকে গুরুত্ব, মর্যাদা, সম্মান দিবে? আপনাকে নিশ্চয়ই নয়!
কিন্তু নিজেদের জন্য আমরা এমন অপমান, অবহেলা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মেনে নিতে চাই না।
আমরা চাই, মানুষ আমাদের শুনুক। বুঝুক। আমাদেরকে কদর করুক।
স্রেফ টাকা কামাই করা দিয়ে আমাদের না মাপুক।
একটু ভেবে দেখুন, আমরা যা কামাই করি, তা কি আমাদের সাথে নিয়ে কবরে যেতে পারব? যারা শুধু নিজের কথাই ভাবে, নিজের জন্য খরচ করে, এবং সেই কাজটা করে নিজেকে ‘সেরা’ ভাবে, তাদেরকে ভালোবেসে মনে করার মতো কয়টা লোক দুনিয়াতে থাকবে? আমি জানিনা, আমার নানু যদি অতি শিক্ষিত, টাকা কামাই করা নারী হতেন, যিনি নিজে নিজে দুনিয়া চষে ফেলেছেন, লাখ লাখ টাকার শপিং করেছেন, নিজের টাকায় বাড়িগাড়ি কিনেছেন, তখন সে মারা গেলে তাকে আমরা ঠিক কতটা মনে রাখতাম? কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি, আমার সাদামাটা নানুকে ভালোবাসার মতো লোকের অভাব হবে না, আজীবনের জন্য তিনি আমাদের স্মৃতিতে আছেন এবং থাকবেন, শুধুমাত্র তার স্নেহ-মমতা আর নিঃস্বার্থ চরিত্রের কারণে। পরিবারের এমন একটি প্রাণীও নেই, যে কিনা নানুর হাতের সুস্বাদু রান্নার প্রেমে পড়ে নি। সবখানে নানুর ভর্তা, ভাজি আর মজাদার সব রান্নার কদর ছিল, সবাই নানুকে জানে ভালো মানুষ হিসেবে, যার কথায় কেউ কোনোদিন কষ্ট পায় নি। মানুষ আসলে মানুষকে তার ভালো কাজ আর ভালো ব্যবহারের কারণেই ভালোবাসে, টাকার কারণে বাসে না। আর যারা টাকা দিয়ে মানুষকে মাপে, তাদের চেয়ে নিচু ও সংকীর্ণ মন-মানসিকতার লোক আর হতেই পারে না, সে যত শিক্ষিত কিংবা স্মার্টই হোক না কেন।
আল্লাহ তা’আলাও মানুষকে ধন-সম্পদ দিয়ে মাপবেন না। চেহারা-সুরত দিয়েও মাপবেন না। আল্লাহ মানুষকে বিচার করবেন শুধুমাত্র তার ঈমান আর আমল দিয়ে। সে আল্লাহকে কতটা ভয় পায়, সেই তাক্বওয়া দিয়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা মানুষটি নিজের টাকায় এত ঘোরাঘুরি আর শপিং কিছুই করেন নাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না খেয়ে পেটে পাথর বেঁধে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন। তার স্ত্রী কখনো বলেন নি, তুমি আগে টাকা কামাই করো, নিজের টাকায় পারলে দুই-চারটা দেশ ঘুরে, তারপর শালীনতার দীক্ষা দিও। (নাউযুবিল্লাহ) ভাগ্যিস, তখনকার নারীরা এভাবে ভাবতো না।
নৈতিকতা, শালীনতা, আর মনুষ্যত্ব নিয়ে কথা বলার জন্য লাখোপতি হওয়া লাগে না। টাকা দিয়ে মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তারাই যাদের কাছে টাকা রবের সমতুল্য।
আসুন, আমরা আল্লাহর দাস হই। পয়সার দাস না হই।