আচ্ছা, তর্কগুলো সবসময় গৃহিণী বনাম চাকরিজীবী হয় কেন? চাকরি যে কোনো অবস্থাতেই করা যাবেনা মেয়েদের, তা তো না, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো চাকরি/ব্যবসা মেয়েদের জন্যেও জায়েয, শরয়ী শর্ত পূরণ করে। কিন্তু মূল প্রশ্নটা হচ্ছে—
❝সন্তান বাবা-মায়ের কাছে আল্লাহর দেয়া আমানত। এই আমানতের লালন-পালন, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান, নিরাপত্তা এগুলো সরবরাহ করা বাবা-মায়ের দায়িত্ব। এখন আপনি জব করেন বা বাসায় থাকেন, যেটাই করেন না কেন, আপনার বা আপনাদের অনুপস্থিতিতে সন্তানের দেখভাল ও লালন-পালনের দায়িত্বটা কে পালন করবে?❞
আপনাকে ৮-১০ ঘণ্টা বাইরে জব করতেই হবে, যদিওবা….
-
নাবালেগ/অবুঝ বাচ্চাদের একা একা নিজের দায়িত্বে রেখে যেতে হয়?
-
অনিরাপদ কাজের লোকের কাছে রেখে যেতে হয়, যে কিনা যেকোনো মুহুর্তে বাচ্চার বড় কোন ক্ষতি করে ফেলতে পারে?
-
কিংবা এমন দাদী বা নানীর কাছে রেখে- যারা নিজেরা নিজেদেরই সামলাতে পারেন না, অথবা যাদের জন্য বৃদ্ধ বয়সে ছোট বাচ্চার ঝামেলা সহ্য করা খুব কঠিন, অথবা যারা এমন অসুস্থ যে নিজেদেরই সেবা দরকার, অথবা আপনার বাচ্চা রাখার জন্য হয়তো তাদেরকে মাসের পর মাস নিজের সংসার রেখে বুড়া বয়সে দূর শহরে এসে বাচ্চা পালতে হচ্ছে, তার নিজের সংসার অন্য কাউকে দেখে রাখতে হচ্ছে??
এখন এই বাচ্চাকে তো আল্লাহ আমানত হিসেবে আপনাদের দায়িত্বে দিয়েছিলেন, আপনারা সেই আমানতের খেয়ানত করছেন। শিশু বাচ্চাটা হয়তো বড় হতে হতে ভুলেও গেছে অনেক কিছু, কিন্তু আল্লাহ তো ভুলে যাননি, সন্তানের হক্ব নষ্ট করার জন্য আল্লাহর কাছে আপনাকে জবাবিদিহি করতে হবেনা?
আমি জব নিয়ে বলছিনা, সেটা কেউ শখে করে, কেউ বাধ্য হয়ে করে, কেউবা সমাজের চাপে, কেউ নিজের ক্যারিয়ার ধরে রাখার জন্য করে, কেউ খেদমতের নিয়তেও করে, কেউবা অভাবী বাবা-মাকে সাপোর্ট দেয়ার জন্যও করে; ব্যক্তিভেদে মাস’আলা ভিন্ন ভিন্ন হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- সন্তানকে হেফাজত করা বা কাজের লোক/ কিংবা অন্য কোন আত্মীয়ের ক্রমাগত বিরক্তির মুখোমুখি হওয়া/ এবিউজড হওয়া/ বড় কোন বিপদে পড়া এসব থেকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্বটা আসলে কার? সবাই যার যার ক্যারিয়ারে ফোকাস করবেন, এই বাচ্চাটার শরীর ও মনোজগতের যত্ন নেয়ার দায়িত্বটা তাহলে কার?
আচ্ছা, এই প্রশ্নের উত্তর যদি না দিতে পারেন, তাহলে বৃদ্ধ বয়সে আপনি যদি একাকী হয়ে যান বা প্যারালাইজড হয়ে বিছানায় পড়ে যান, তখন কি এই একই বিষয়গুলো মেনে নিতে পারবেন? -
আপনার সন্তানেরা দূরদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চলে গেছে, আপনি বাড়িতে একা মৃত্যুর প্রহর গুণছেন।
-
আপনার সন্তানেরা ডিগ্রি, ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে ‘চাইল্ড কেয়ার হোম’ এর মত আপনাকেও নিরাপদে ‘ওল্ড হোম’ এ রেখে এসেছে, ওখানে আপনি নিরাপদ পরিবেশে সমবয়স্কদের সাথেই আছেন, বিষয়টা আনন্দের না?
-
আপনার সন্তানেরা টাকা দিয়ে এমন কোন কেয়ার গিভারের কাছে আপনাকে রেখে চলে গিয়েছে, যেখানে কেয়ার গিভার আপনাকে একলা, দুর্বল পেয়ে সুযোগ পেলেই এবিউজ করছে, আপনার প্রতিবাদের কোন সুযোগ নেই?
জ্বি, আপনি একাকী বিছানায় কাতরাতে কাতরাতে মরে গিয়েও প্রাউড হবেন- ‘আমার সন্তানেরা উচ্চশিক্ষিত হয়েছে’, ঠিক যেভাবে আপনাদের অভাবে কাদতে কাদতে বড় হওয়া বাচ্চাটা তার অসুন্দর শৈশব নিয়েও প্রাউড ফীল করে, ‘আমার মা উচু পজিশানে আছে’!
কি চমৎকার অসভ্য এক সভ্যতা! যে সভ্যতা বস্তুবাদের কাছে তার সবটুকু সারসত্ত্বা হারিয়েছে!
চলেন, সবাই এমন ‘প্রাউড’ হই। ‘বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের হক্ব, বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছে বাবা-মায়ের হক্ব’ বলতে ইসলামে যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো আছে, সব ভুলে যাই। যে করেই হোক, আমাদেরকে তো প্রাউড হতেই হবে সমাজের কাছে; প্রয়োজনে পরিবার ধ্বংস করে হলেও…