পতিতাবৃত্তির ব্যাপারে আমাদের সাধারণ ধারণা হলো—কোনো নারী শখে বা স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসে না। সমাজের অতি নিম্নস্তরের সহায়হীন নারীরা দারিদ্র্যের কষাঘাতে এই পেশা বেছে নেয়। আবার কখনো তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয় পতিতালয়ে। বাধ্য হয়ে পতিতাবৃত্তিতে লিপ্ত থাকে। এমন করুণ অবস্থায় আমাদের তাদের জন্য করুণা হয়। ইসলামে ব্যভিচার স্পষ্ট হারাম (সুরা নূর ২৪:২), আর ব্যভিচারকে পেশা বানানো বা তার স্বীকৃতি দেওয়া নীতিগতভাবে গর্হিত। কুরআনে আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেনঃ

“আর ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না। এটি একটি অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ।” (সুরা আল-ইসরা, ১৭:৩২)

সাধারণভাবে দেখলে, কোনো কিছু ভালো হওয়া না হওয়া নির্ভর করে কাজটির ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিণতির ওপর। ধর্মীয় লেন্স বাদ দিতে চাইলে সেখানে যৌক্তিক (logical) মূল্যায়নের কথা আসবে। কিন্তু যাচাইয়ে অনুত্তীর্ণ অনেক কিছু চাইলেই অধিকারের মোড়কে দাবি করা যায়। মানবতার সুযোগ নিয়ে “পতিতাদের পেশাও তো একটা পেশা”—এমন দাবি এবং পতিতাবৃত্তিকে সম্মানজনক বানানোর প্রয়াস যুক্তিতে অনুত্তীর্ণ। এখানে মানবতার দোহাই দিয়ে মানুষের অসহায়ত্ব এবং করুণাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। মানবতাকে ব্যবহার করে এই কাজটাই করে মানবতাবাদ। অথচ হিউম্যানিটি ও হিউম্যানিজম—দুইটি ভিন্ন জিনিস।

মানুষ দারিদ্র্যের কারণে চুরি করে। চৌর্যবৃত্তিতে জড়িতকে চোর বলা হয়, কিন্তু চুরিকে আমরা কখনোই পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিই না। “যৌনকর্মী” শব্দটি অনেক আগে থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে, আর এখন সেটিকে সম্মানজনক একটি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠছে। এভাবেই শুরু হয়েছিল ‘স্লাটওয়াক’ আন্দোলনও।

“পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়”—এই কথাটির বাস্তব প্রয়োগ এখন এমন এক ধাপে গিয়ে ঠেকেছে যেখানে পাপীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করতে করতে এখন পাপকেও ভালোবাসার দাবি করা হয়।

পতিতাবৃত্তি, সমকামীতা, ফ্রি সেক্স—ইত্যাদির ক্ষতিকর দিকগুলো বিবেচনা করলেই এগুলোকে স্বাভাবিক বা সম্মানজনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। এগুলো যৌনবাহিত রোগের বিস্তারের উৎস। যশোরে গেল বছরের শেষ দিকে ২৫ জন শিক্ষার্থী এইডসসহ বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগে শনাক্ত হয়েছে, যারা এসব প্র্যাকটিসের সঙ্গে জড়িত ছিল। শনাক্ত না হওয়া আরও কত শিশু, কিশোরী, নারী পড়ে আছে অন্ধকার নোংরা কুঠুরিতে, তা অজানা।

সরকারি গবেষণা অনুযায়ী, পতিতাবৃত্তির কারণে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ জন নারী দেশ থেকে পাচার হয়। প্রায় ৮০ হাজার শিশু পতিতালয়ে কাজ করে। পতিতাবৃত্তিকে সম্মানজনক পেশা বানিয়ে দিলে আপনার কি মনে হয় এই প্র্যাকটিস থেমে যাবে? না, বরং তার গতি বহুগুণে বেড়ে যাবে। ফ্রি সেক্স কিভাবে ধর্ষণের হার বাড়ায়, তা আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দেশে যেখানে ধর্ষকের উপযুক্ত শাস্তি হচ্ছে না, সেখানে পতিতাবৃত্তিকে স্বীকৃতি দিয়ে সরকার কীভাবে নারী ও শিশুদের নিয়ে চলমান স্ক্যাম বন্ধ করবে? উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও এই হার আমাদের থেকে অনেক বেশি।

১৯৯৯ সালের ২৭–২৯ জানুয়ারি ঢাকার শেরাটনে যৌন নিপীড়নবিরোধী বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের ৫৬ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। বক্তাগণ পতিতাবৃত্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে আখ্যায়িত করে এ পেশা বন্ধের দাবি জানান। তারা সুইডেন ও ভেনেজুয়েলার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, “দেশ দুটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধ করেছে এবং এর জন্য শাস্তি ও জরিমানাও নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি পতিতাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করেছে। কাজেই তাদের নিকট থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।”

যেহেতু এটি যুক্তিতে দাঁড়ায় না এবং ক্ষতির দিকটি ব্যাপক, তাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্র পতিতাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ করেছে। কোনো জাতি যখন অন্ধকার যুগ পেরিয়ে পুনরুত্থান ঘটায়, (যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়) তখনই আমরা দেখি তারা পতিতালয় বন্ধ করে এবং পতিতাবৃত্তিকে নিষিদ্ধ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেও একসময় ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। তারপরও কিভাবে পতিতাবৃত্তি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পেল? কারণ, মানবতাকে পাশ কাটিয়ে মানবতাবাদের উত্থান ঘটেছে।

স্বেচ্ছায় অনেক নারী পতিতাবৃত্তিতে জড়ায়, যৌন পেশাকে গ্রহণ করে। তসলিমা নাসরিনের মতো নারীর সংখ্যা একেবারে কম নয়। প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে পড়ে এই পেশায় ঢোকা, অথবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ চালাতে এই পেশাকে বেছে নেওয়া—এমন উদাহরণও সমাজে আছে।

অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়ানো মেয়েদের উদ্ধার করা মানবতার দাবি। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে জড়ানো নারীদের দাবির বদৌলতে এই পেশাকে সম্মানজনক স্বীকৃতি দেওয়া হলে নারী-শিশুদের নিয়ে চলমান স্ক্যাম আরও লাগামহীনভাবে চলতে থাকবে। ইচ্ছাকৃতভাবে জড়ানো নারীদের জন্য এই পেশাকে নিষিদ্ধ করা জরুরি—এর ব্যাপক কুফলের কারণে। এর পেছনে কোনো করুণার বিষয় নেই। অথচ নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের আলোচনার বিষয় এখন এ শ্রেণির নারী।

রাষ্ট্রের উচিত ছিল এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে কোনো নারী দারিদ্র্যের কারণে পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিতে বাধ্য না হয়। পতিতালয়ের জাল থেকে নারীদের মুক্ত করে তাদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। নারী পাচার রোধ করা, ধর্ষণের শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার ছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোনো অগ্রগতি না থাকলেও পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবনায় অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। আর যদি এটিকে স্বতঃস্ফূর্ত পেশা হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়, তবে যেসব অপরাধ ও অনৈতিকতা বন্ধ হওয়ার কথা, সেগুলো বরং দ্বিগুণ গতিতে ছড়িয়ে পড়বে।

এমনকি ধর্মীয় লেন্সকে বাদ রেখেও রাষ্ট্রপক্ষ বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলো পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধের পক্ষে কথা বলেছে। মার্কিন ইতিহাসে এই বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়নি ত্রিশ বছরও হয়নি। কিন্তু আমাদের দেশে এই পথে এগিয়ে গেলে, তা চলমান নারী ও শিশু নির্যাতনের শতবর্ষ পূর্ণ করবে—নিশ্চিতভাবেই। (ঈর্ষৎ পরিমার্জিত)