নারী অধিকার ও নারীবাদ দুইটা ভিন্ন বিষয়। নারীবাদকেই নারী অধিকারের সূচক ভাবতে হবে কেন? নারীবাদের শেকড় ১৮ শতকের শেষ দিকে। উত্থানের পর যা সময়ের সাথে বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় হয়ে আজকের রূপ নেয়। নারীবাদ কী, তা কী চায় বুঝতে নারীবাদের তিনটা ওয়েভকে খুঁটিয়ে দেখতে হবে। একাডেমিকালি, হিস্ট্রিকালি আর ফলাফলগত দিক থেকে এগুলোই নারীবাদ। নারী রিলেটেড সর্ব অধিকারের কারখানা নয়।
নারীবাদের ফার্স্ট ওয়েভ ছিলো নারীর ভোটাধিকার অর্জনকে কেন্দ্র করে। এখনকার উন্নত ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোতে তখন নারীদের ভোটাধিকার ছিলো না। সেকেন্ড ওয়েভ ছিলো নারীর সামাজিক ও আইনগত সমতা প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে। তখন নারী ও পুরুষকে প্রতি সেক্টরে সমান গ্রাহ্য করার দাবি ওঠে। উন্নত তথা নারীবাদের থার্ড ওয়েভ হলো সমাজে লিঙ্গের প্রথা ভাঙা। তথা বিশ শতকের শেষভাগ থেকে নারীবাদ জুড়ে যায় লজবটক আন্দোলনের সাথে।
খেয়াল করবেন, নারীবাদের এই তিন ওয়েভে কেন্দ্রে যে বিষয়গুলো ছিলো তার চতুর্পার্শ্বে আরো কিছু বিষয় ছিলো যা নারীবাদী আন্দোলনে শ্রমিক-গ্রামীণ এবং গৃহিণী নারীদের অন্তর্ভুক্ত করে। তা হলো শোষণ আর নারীদের ঘরে অত্যাচার-নিগৃহীত হওয়া।
নারীবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছে ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলো থেকে, ইসলামি ভূখন্ডগুলো থেকে নয়। এখনকার নারী অধিকারের বুলি আওরানো দেশগুলোতে নারীদের সাথে একসময় স্লেইভসুলভ আচরণ করা হতো। উল্লেখ্য, ১৮ শতকের শেষ ভাগের কিছুকাল পূর্বেই ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে বিনষ্ট করে নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের গোড়াপত্তন। ইসলামি শাসনব্যবস্থায় মুসলিম নারীরা শিক্ষায়, আদালতে অধিকারে যে মর্যাদা ভোগ করে আসছিলো তা ইউরোপের নারীদের জন্য ছিলো স্বপ্ন। ইসলামি শাসনব্যবস্থা বিনষ্ট হলে মুসলিম ভূখন্ডগুলোতে নির্যাতন চাপিয়ে দিয়ে মুসলিম নারীদের জীবনকে ত্রাস বানাতে চাইলো নতুন বিশ্বব্যবস্থা।
ইসলাম স্বরূপে থাকলে নতুন বিশ্বব্যবস্থা থাকে না। তাই নারীদের স্লেইভসুলভ ব্যবহার করা ইউরোপ চাইলো নারীসমাজের আদর্শের স্টেইক ওয়েস্টে নিয়ে আসতে। সাথে সাথেই মুসলিম নারীকে ইসলামের আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে। তাতে জেনারেশন আফটার জেনারেশন মুসলিম নারীরা ওয়েস্টকেই আইডলাইজ করবে এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার টেক্কায় ইসলাম স্বরূপে আবির্ভূত হবে না।
ইউরোপ জুড়ে যেহেতু নারীর অবস্থান ছিলো সম্মিলিতভাবে গোটা সমাজে পালিত কুকুরের মতো, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নারী তাই নারীবাদী আন্দোলনে মিশে যায়। সেক্যুলার এবং ডেমোক্রেটিক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পরেও নারীদের ওই সমাজে অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে হয়েছে –বিষয়টা হাস্যরসেরই বটে।
অপরদিকে ইসলামি শাসনব্যবস্থা উঠে যাবার পরেও ধর্মপ্রাণ ও আল্লাহ ভীরু মুসলিম সমাজে নারীকে সম্মিলিতভাবে নিষ্পেষিত করা হয়নি। অতঃপর মুসলিম সমাজের শতধা বিভক্তি, ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া অধিকাংশ মুসলিম নিজেদের মধ্যে নানা অবিচার চর্চা করা শুরু করলো। তার একাংশ গিয়ে পড়ে নারীর প্রতিও। উদাহরণস্বরূপ আল্লাহর নির্ধারণ করা সম্পদের অংশ নারীকে বুঝিয়ে না দেয়া। অবিচার নির্মূলে থাকলো না কার্যকরী তথা ইসলামি আইন। একসময় মুসলিম সমাজেও ঢুকে পড়লো ‘সমতাই সমাধান’।
নারীবাদ আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে নারী ভোটাধিকার, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার সমতা, সম্পদে সমতা ও এলজিবিটি আন্দোলন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। নারীবাদের কেন্দ্রকে ঘিরে যেই বিষয়গুলো ছিলো, যার কারণে সাধারণ নারীসমাজের অন্তর্ভুক্তি দেখলাম সেগুলি কি বাস্তবায়ন হয়েছে? না, হয়নি। পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক-গ্রামীণ নারীর শোষণ, উন্নত এবং নারীবাদ ফ্লারিশ করা দেশগুলোতে নারী নির্যাতন শেষ হয়নি। এখনো ইউরোপ আমেরিকাতে নারীদেহ বিক্রি হয়, স্লেইভসুলভ আচরণ হয়। ওই দেশগুলোতে গৃহভ্যন্তরে নারী নিরাপদ নয়। তাদের প্রতি সহিংস আচরণ ও তাদের নিকৃষ্ট মনে করা নাগরিকের সংখ্যা নির্ণয়কারী জরিপগুলো মাঝেমাঝেই চিন্তাশীল মানুষকে অবাক করে।
সত্যি বলতে, চতুর্দিকে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধান নারীবাদের কাছে না থাকলেও ইসলামের কাছে আছে। নারীকে নিকৃষ্ট মনে করা, নিজ মা-কন্যার সাথে অজাচারে জড়িত জাতির কাছে ইসলাম নারীকে পরিচয় করিয়ে দিলো মা হিসেবে, পুরুষের সম্পূরক হিসেবে, অন্দরমহল থেকে জেনারেশন গড়ার কারিগর হিসেবে। পাশাপাশি নারীকে পণ্যতে পরিণত করাও বন্ধ করে ইসলাম।
আর নারীবাদের কেন্দ্রের বিষয়? নারীর ভোটাধিকার। ইসলামি শাসনব্যবস্থায় শাসক নিযুক্ত হয় শিক্ষিত এবং চিন্তাশীলদের পরামর্শের ভিত্তিতে। কোনো সুদখোর, ঘুষখোর, মাতাল, যিনাকারীর ভোটের উপরে নয়। তাই সমাজের শিক্ষিত, তাকওয়ার অধিকারী মুসলিম সমাজই নিযুক্ত করে শাসক। এতেই দমন হতে পারে দুর্নীতিবাজদের। নারীদের মধ্যে বিদুষী, তাকওয়ার অধিকারী নারীরা তাদের পরামর্শ দেয়। মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিরা এমন নারীদের কাছে দূত পাঠিয়ে জেনে নেয় তাদের মতামত। কেউ কেউ নিজের পক্ষ থেকে পাঠায় প্রতিনিধি, মতামত নেয় নিজ ঘরের পুরুষ। এভাবে মূল্যায়নের যোগ্য প্রত্যেক মূল্যায়নকারী নারী পুরুষের প্রতিনিধিত্ব ঘটে। এটাই ইসলামি কাঠামো প্রণয়ন।
সর্বসমতা। সমতা কোনো সমাধান নয়। ইসলাম বিশ্বাসী সুষম আচরণে। খাবার যেমন খেতে হয় সুষম পুষ্টি বিচারে। ভাত-মাংশ-ডিম-চর্বি সমপরিমাণ চলে না। তাদের ভিন্ন জেন্ডার রোল আছে। আর সম্পদ সীমিত। সীমিত সম্পদকে বন্টন করতে হবে এমনভাবে যাতে সবাই তার অধিকার পায়। ইসলামি বণ্টনব্যবস্থায় নারী কেবল পুরুষের অর্ধেক পায়? না। কখনো অর্ধেক, কখনো বেশি, কখনো সমান, কখনো নারী পেলেও পুরুষ পায় না।
আর হলো লজবটক। ইসলাম নারী পুরুষের বাইনারি নিশ্চিত করে। ভুলদেহে জন্ম নেয়ার কন্সেপ্টকে বাতিল করে।
নারীবাদ তার কেন্দ্র ছাড়া কিছু নয়। সাপোর্টিং সমস্যার সমাধান সে দিবে না। তাই নারীবাদ মেয়েদের স্কার্টের পরিবর্তে ট্রাউজার পড়ার স্বাধীনতা দিয়েছে এমন কথায় মুসলিম নারীদের যায় আসে না। তারা বলে চতুর্দিকের সমস্যা নারীবাদ দিয়ে সমাধান করবে, সাথে সাথে ডিমোলিশ করবে ইসলামি মূল্যবোধকে। নারীবাদের কারণে ভাত পেয়েছি, শিক্ষা পেয়েছি এসব আওড়ে গেলো অনেকে। তারা জিজ্ঞেস করুক স্টেটব্যবস্থাকে, নতুন এই বিশ্বব্যবস্থাকে যারা ইসলাম ডিমোলিশ করে মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন করবে বলে। এমন ব্যবস্থায় কেন নারীকে তার অধিকার ভিক্ষা করতে হয়? আমার প্রশ্ন সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কেন নারীবাদের মুভমেন্ট নাই? নারীবাদের মুভমেন্ট তবে কেন ইসলামি মূল্যবোধের বিরুদ্ধেই? জবাব পাঠক পেয়েছেন।
শিক্ষাব্যবস্থায় মুসলিম নারীদের আকাঙ্খা নয় পুরুষের পাশাপাশি আসা। মুসলিম নারীরা চায় পৃথক ব্যবস্থা। নারীবাদের আগে ইউরোপ আমেরিকায় নারীরা এক রকম মূর্খ, অজ্ঞ ছিলো, তবে মুসলিম বিশ্বে নয়।
নারীবাদ যে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায় তা রক্ষার জন্য সত্যিকার সমস্যাকে ইউজ করে। কিন্তু দিনশেষে সমস্যার সমাধান তো দেয়ই না, নারীকে আরো অপদস্থ আর নিরাপত্তাহীন বানায়। ধ্বংস করে পরিবার ব্যবস্থা, নারী পুরুষের সহাবস্থান।এর বিপরীতে সমস্যার সমাধানে আমরা অন্বেষণ করি মহাজ্ঞানী আল্লাহর দেওয়া ইসলামি আইনব্যবস্থা।ইসলামি শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নে ইসলামের স্বরূপে একজন নারী হিসেবে গড়ে তুলি নিজেদের। আমরা অস্বীকার করি ওয়েস্টের আইডলাইজেশন।